Home গল্প আমি আমার স্ত্রীকে অনেক ভালোবাসতাম – সিয়াম সাদমান আল অনি

আমি আমার স্ত্রীকে অনেক ভালোবাসতাম – সিয়াম সাদমান আল অনি

187
5

আমার স্ত্রী নন্দিনী মারা গেলো এক সপ্তাহ। বিয়ের তিন-বছরের মাথায় মারা গেলো মেয়েটা। ওকে ছাড়া ঘর-বাড়ি, বাড়ির সামনের উঠোন, উঠোনের ছোট বাগান সব কেমন শূন্য শূন্য লাগে। বাগানে নন্দিনী আলু-করলা চাষ করতো, অদ্ভুত হলেও নন্দিনীর প্রিয় খাবার ছিলো আলু আর করলা ভাজি। তার যতসব উদ্ভট পছন্দ-অপছন্দের জন্যই হয়তো আমি তাকে ভালোবাসতাম আরো বেশি করে। আমি ওকে প্রচন্ড ভালোবাসতাম, প্রচন্ড। ক্যান্সার হয়েছিল মেয়েটার।

যেহেতু আমি একজন ডাক্তার এবং ৪ বছর আগেই কেবল এমবিবিএস পাশ করেছি, তাই অর্থনৈতিক কারণেই বেশিদিন শোক পালন না করে চ্যাম্বারে যাচ্ছি আজ। এমবিবিএস পাশ করার ১ বছর পরই বাবা-মায়ের পছন্দে বিয়ে করি নন্দিনীকে। আমি তাকে বিয়ে করে সুখী ছিলাম অনেক। আর যা হোক, নন্দিনীর মতো লক্ষী মেয়ে হয়তো আমি লাভ ম্যারেজ করলেও পেতাম না।

চেম্বার এর তালা খুলে টেবিলে বসলাম। কোন রোগী আসছে না, সদ্য এমবিবিএস পাশ করা ডাক্তার এর কাছে রোগী আসলে কমই আসে।
যদিও আমি মেডিকেলে পড়াশুনা করা কালীন ফার্মাকোলজি ও ফরেনসিক, বায়োকেমিস্ট্রি তে রেকর্ড মার্কস পেয়েছিলাম। কিন্তু ওসব দেখে কে! যে ডাক্তারের যত বেশি ডিগ্রী, তার মূল্য বাজারে তত বেশি।

টেবিলের ড্রয়ারে চোখ পরতেই দেখলাম একটা মেডিকেল রিপোর্ট। নন্দিনীর মেডিকেল রিপোর্ট।
গত বছরের শুরুতে হঠাৎ বাসায় এক মুখোশধারী লোক ঢুকে পরে। আমাকে ওয়াশরুমে বন্ধ করে দিয়ে লোকটা নন্দিনীকে ধর্ষণ করে। প্রায় ২ ঘন্টা যাবৎ আমি বাথরুমে বন্দী ছিলাম। তারপর নন্দিনী কান্না করতে করতে এসে দরজা খুলে দেয় ওয়াশরুমের। আমি বেরিয়েই ওই লোকটাকে খোঁজার চেষ্টা করি, পুলিশে রিপোর্ট করতে চাইলে নন্দিনী আমাকে বাধা দিয়ে বলে মানুষ জানাজানি হলে তার সম্মান রইবে না আর। আমি আমার ধর্ষিতা স্ত্রীকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে পাগলের মতো কান্না করেছিলাম। তারপর নিজেকে শক্ত করে মুটামুটি জোর করেই নন্দিনীকে আমার চ্যাম্বারে নিয়ে এসে তার নমুনা সংগ্রহ করলাম, এক্সামিন করলাম তার লজ্জাস্থান। তারপর নমুনা সংরক্ষণ করে তাকে নিয়ে বাসায় ফিরলাম কারণ আমার স্ত্রী খুব খারাপ বোধ করছিলো। আমারও মানসিক অবস্থা বাজে ছিলো। সেদিন আমি আমার স্ত্রীকে এক মুহুর্তের জন্যও বুক থেকে সরাই নি। তার মাথা আমার বুকে নিয়ে শুয়েছিলাম অনেক্ষণ। হঠাৎ মনে হলো, এই লোককে ক্ষমা করা যাবে না। ক্ষমা করলে আবার হুটহাট বাসায় চলে আসবে। পুলিশকে প্রমাণ দেওয়ার জন্য আমার তাড়াতাড়ি করে নন্দিনীর মেডিকেল রিপোর্ট তৈরী করতে হবে।
আমি পরের দিন চ্যাম্বারে গিয়ে মেডিকেল রিপোর্ট তৈরী করলাম।

নন্দিনী সারাদিন মন খারাপ করে বসে থাকতো। তাই ওকে আলু, করলার বীজ এনে দিলাম। বললাম উঠানে বাগান করতে। এমনিতেও তার প্রিয় সবজি এই আলু-করলা। সে বাগান করা শুরু করলো, আস্তে আস্তে আমার স্ত্রী সুস্থ হয়ে উঠলো।

এখন আর মন খারাপ করে বসে থাকে না সে। আমি বুঝতে পারলাম এইতো সুযোগ, একবার নন্দিনীর সাথে কথা বলে দেখি, সে পুলিশকে জবানবন্দি দিতে রাজি হয় নাকি। অনেক জোরাজোরির পর রাজি হলো সে। তবে নন্দিনীর শর্ত একটাই। তার নাকি কোন পরিচিত লোক আছে, যিনি পুলিশের এডিশনাল আই.জি। শুধু মাত্র উনার কাছেই নন্দিনী মুখ খুলবে। আমিও রাজি হলাম।

কদিন পর পুলিশের এডিশনাল আই.জি সাহেব আসলেন বাসায়। নন্দিনী উনার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলো। তারপর উনার কাছেই আমার স্ত্রী জবানবন্দি দিলো সেই নিকৃষ্ট দিনের। নন্দিনী বলছিলো আর কান্নায় ভেঙে পরছিলো।

পুলিশে রিপোর্ট করার পর অনেক দিন হয়ে গেলেও কোন খোঁজ খবর নেই। না থানা থেকে কোন কল আসে, না নন্দিনী আমাকে থানায় কল করতে দেয়। নন্দিনী কান্না করে বলে, “এ দেশের আইন এর সাহায্য চেয়ে লাভ নেই নির্বাণ, এরা আমাকে আরো লাঞ্চিত করবে, দেশের সিস্টেম টাই খারাপ। আমি বোধ হয় অপবিত্র হয়ে গেছি তোমার জন্য। তুমি চাইলে আমাকে ছেড়ে দিতে পারো।” নন্দিনী কাঁদে আমার হৃদয় গলে যায়। আমারও আর ফোন দেয়া হয় না থানায়। আমি নন্দিনীকে বুঝাই, “না, এমন কিছু না, আমি সব সময় তোমাকেই ভালোবেসেছি”। আমি নন্দিনীর পাশে দাঁড়াতে চাই আর সে আমার থেকে, সোসাইটি থেকে পালাতে চায়।

এসব ঘটনার ছ’মাস কাটিয়ে যখন আমরা ভালোই ছিলাম, তখন হঠাৎ নন্দিনীর ক্যান্সার ধরা পরে। আস্তে আস্তে নির্বানের নন্দিনী মারা যায়। আমার ভালোবাসা মারা যায়। আমি একা হয়ে যাই, বিশ্বাস করুন, আমি আমার নন্দিনীকে প্রচন্ড ভালোবাসতাম।

আসলে ব্যাপারটা কি জানেন?
আমিই আমার স্ত্রীকে হত্যা করেছি। কিভাবে জানেন? তার শরীরে ক্যান্সার সৃষ্টি করে। আসলে সে যে বাগানটাতে আলু চাষ করতো, আমি সেই বাগানের মাটিতে ব্যাটারির ইলেকট্রোড পুঁতে দিয়েছিলাম। ব্যাটারির ইলেকট্রোড এ থাকে ক্যাডমিয়াম, ক্যাডমিয়াম শরীরে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ভারী ধাতু। আস্তে আস্তে মাত্র ১০০০ মিলিগ্রাম ক্যাডমিয়াম ঢুকিয়ে দিলাম আর আমার স্ত্রী এর মৃত্যু ঘটলো। আমার প্রচন্ড ভালোবাসার মানুষকে আমিই হত্যা করলাম। কেন হত্যা করেছি জানেন?

কারণ সে আমাকে চিট করছিলো! ইয়েস, শি ওয়াজ চিটিং অন মি। যখন তার রেপ হলো, আমি তার মেডিকেল রিপোর্ট তৈরী করেছি, আসলে তার রেপ হয় ই নাই। সেই রেপ এ তার সম্মতি ছিলো, কারণ, স্ট্রাগল এর কোন সিম্বল আমি পাই ই নাই তার শরীর থেকে সংগৃহীত নমুনায়।
তাছাড়া যে লোক বাসায় ঢুকেছিলো সে নন্দিনীকে রেপ করা ছাড়া, বাসার আর একটা জিনিসেও হাত দেয় নাই। কোন কিছু চুরি করে নাই, কিছুই না।
তারপর সেই নন্দিনীর পরিচিত পুলিশ! আসলে ওই লোক পুলিশ ছিলোই না, ছিলো ভাড়া করা কোন লোক।
কিভাবে বুঝলাম?
নন্দিনী আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে এই বলে যে ওই পুলিশ নাকি এডিশনাল আই.জি অফ পুলিশ!

এডিশনাল আই.জি’র কাঁধের ব্যাজে ১ টা তলোয়ার, ১ টা ছড়ির ক্রস, ১ টা শাপলা থাকে।
আর নন্দিনী আমাকে যে লোকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে তার কাঁধে ১ টা শাপলা, ১ টা ছড়ির ক্রস আর ১ টা পিপ। অথচ পুলিশদের এরকম কোন ব্যাজই নাই।
আমি তখনই বুঝে গিয়েছিলাম যে সবকিছু সাজানো, সব।
যেহেতু সেদিন ধর্ষণকালীন সময়ে তার কনসেন্ট ছিল, তার মানে ওই লোক নন্দিনীর পরিচিত, হয়তবা নন্দিনীর প্রেমিক।

নকল পুলিশ এর ব্যাপারটা ধরতে পারার পরেই আমার বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিলো নন্দিনী আমি ব্যতীত অন্য কারো সাথে সম্পর্কে আছে।

বিশ্বাস করুন, আমি আমার স্ত্রীকে প্রচন্ড ভালোবাসতাম

5 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here