Home গল্প কাব্যপিয়নের নীলখাম ।। মেহেরাব অভি

কাব্যপিয়নের নীলখাম ।। মেহেরাব অভি

92
0

কাব্য, শরাফত আলীর একমাত্র ছেলে। কাব্য সহ আরো তিন কন্যার জনক তিনি। পেশায় ডাকপিয়ন। তার স্ত্রী অনিপা বেগম, চুপচাপ আর সর্বদা ঘরের কাজেই নিয়োজিত। এক প্যাকেট মরিচ গুড়ার জন্যেও তাকে বের হতে হয় না। শরাফত আলীর সবদিকে সমান নজর।

দিনভর চিঠি বিলির পর শরাফত আলী অপরাহ্নের সময়টুকু বিলি করতে বাড়ি পৌঁছেছেন মরিচাধরা এক সাইকেল এ ক্রিংক্রিং করতে করতে!

পিচ্চি মেয়েটা হুড়মুড় করে এসে বিচার দিচ্ছে, আব্বু! আব্বু! বড় বুবু আমারে বকে। টিভির রিমোট দেয় না।
– কে রে? আমার সোনামণি কে রিমোট দেয় না?
বাবার গম্ভীরমুখ দেখে মেজো মেয়েটা কাঁদোভাব নিয়ে বলে, বড় বুবু আমাকেও আচার খেতে দেয় নি।
– বড় বুবু খুব জ্বালাচ্ছে তোমাদের না?
বড় মেয়েটা মন খারাপ করে বলে, ও! আমি এখন কয়লামণি হয়ে গেছি, তাই না?
রাতারাতি সরগরম হয়ে উঠে বাড়িটা।

কাব্যর একমাত্র ভালো বান্ধবী এবং প্রতিবেশী হচ্ছে রচনা। তাদের লেবু বাগান আছে। ও কলেজ থেকে এসেই রচনাদের লেবু বাগান থেকে রসদ লেবু এনে বাবার জন্য শরবত বানিয়ে রচনাদের ফ্রিজ এ রেখে এসেছিলো।ঐ শরবতের গ্লাস ও হাত এ পিড়ি নিয়ে এ একটু জোড় গলায় বলল,
এই তদের বকবকানি শেষ? এবার তামাশা বন্ধ কর। বাবা! এখানে বস। আর এই শরবত টা তিন ঢোকে খাও।

একথা শুনে তিন মেয়ের মাঝে সঠিক বিচার না পাওয়ার কাঁদোকাঁদো ভাব আসে। একরুম সবাই। বড় মেয়ে এসে শাসন করার ভঙ্গিতে বলে,
টিভির দিকে তাকাইলে তো খালি ওইটার দিকেই তাকায় থাকস! ওইটা বন্ধ থাকলে তো তিনজন তিনজনেরই মুখ দেখি আর একটু গল্পসল্প করা যায়।
পুচকিটা জ্ঞানী ব্যক্তির মতো বলে, টিভির ভেতর আমি আর বুবু যাই, তাইলে বড় বুবু টিভি দেখলে আমাদেরও দেখবো।
সবাই হাসিতে ফেটে পড়ছে।।

পরদিন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চললো,
বাড়ির সকলের খাওয়া শেষ তবে কাব্য তার বাবার সঙ্গে খাবে বলে এখনো খায়নি। সে তার মার কাছ থেকে দেখে দেখে কিছু রান্না শিখেছে। টমেটোর চাটনি, মাছ ভাজি, ডাল। মুখ মোছার জন্য গামছা এগিয়ে দিতে গিয়ে কাব্য বললো, বাবা! আজ তোমার জন্য টমেটোর চাটনি বানিয়েছি।
শরাফত আলী খুশিতে ছেলের কপালে বাপ আমার বলে চুমু খেয়ে বললেন,
– অনিপা দেখেছো, ছেলে আমার কতো খেয়াল রাখে।
অনিপা বেগম মুচকি হেসে বলে, ও তাই বুঝি? ছেলেটা আসার আগে কে খেয়াল রাখতো গো তোমার? বলেই হেসে দিলো।

খাওয়া শেষে কাব্য বাবার ডান হাতে কাচুমাচু করে শুয়ে পড়লো। শরাফত আলীও আহ্লাদে আটখানা হয়ে জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে। পাশের ঘরেই অনিপা বেগম তার তিন মেয়ের সাথে লুডু খেলায় মেতে উঠলেন।

কাব্য, তার বাবার কাছে সব প্রশ্নের সুন্দর জবাব পায়। তাই সে সব কথাই বলে তার বাবাকে। অন্য পাচটা ছেলের মতো দূরে দূরে থাকে না। অতি উৎসাহে কাব্য বললো,
বাবা? দু’দিন পরে রচনার জন্মদিন, আমি একটা গিফট দিতে চাচ্ছিলাম। কি দেয়া যায়? বাবা কয়েক সেকেন্ড ভাবে তারপর মুচকি হাসিমুখে বলে,
– শোন, একটি জন্মদিনের চিঠি লিখে নীল খামে ভরে কাব্যপিয়ন সেজে ওর বাসায় গিয়ে ওর হাত এ চিঠিটা দিয়ে আসিস। দেখবি ও হাসতে হাসতে কাহিল হয়ে যাবে।
ছেলে বাবাকে আশ্বস্ত করে, কী দারুন বুদ্ধি তোমার! তারিফ করতে হবে। এর পর একটু চাপা গলায় বলল,
বাবা শুনো? এবার ঈদে তোমার জন্য একটা বাদামী রঙের বানাবো। আমার জন্যেও একই রঙের। একটা আতর কিনে দু’জন লাগিয়ে একসাথে যাবো নামাজ এ। এবার আর না করোনা।
একটু থেমে আবার, দাদুর কাছেও যাবো।বোনদের দাদুর আদর থেকে দূরে রাখা ঠিক হচ্ছে না। ওহ! কাল জুতো কিনবো না, দুমাস পর ঈদেই কিনবো একসাথে। আর মাকে একটা জলপাই রঙের হিজাব কিনে দিবো।আম্মুর পছন্দসই হবে। নামাজ পড়বে এটা পড়ে।মন ভরে সকলের জন্য দোয়া করবে।

বাবা এতোক্ষণ মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন পরে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
-আমি তোর সব কথা মানলাম। পড়াশোনায় খামখেয়ালি করিস না। ঈদ পেরুলেই ফাইনাল। আমি যাতে রচনার বাবার সামনে বুক ফুলিয়ে তাকাতে পারি সেই সম্মান টুকু রাখিস।
কাব্য বাবাকে আল্লাহ ভরসা বলে আশ্বাস দিল।

সন্ধ্যা হয়েছে, খুব সকালে ওর বাবা বের হয়ে যায় বলে ওরা সবাই বেশি রাত না জেগে খাবার খাওয়া শেষ করে। মা’কে ঔষধ দিতে গিয়ে কাব্য লক্ষ্য করে ওর মা’র কপাল এ কালশিটে দাগের মতন। ছেলে খুব উদ্বেগ নিয়ে বলে,
-মা! কী ব্যাপার? কপালে কি এটা?
-কই, না রে বাপ ও কিছু না।
কাব্য জানতো তেল ছিটকে চামড়ায় পড়লে এরকম দাগ হয়। ভ্রু কুচকিয়ে তাই মাকে বললো, তেল ছিটকে এসেছে? কীভাবে পড়লো?
আর কারোও চোখ না গেলেও কাব্যর সতর্কচোখ ঠিকই দেখেছে। তরিঘরি করে রচনার বাসা থেকে বরফ এনে মায়ের আঁচলে বেধে কপালে ধীরে স্বস্তিতে লাগায়। মা সত্যিই খুব আরাম বোধ করছে।

অনিপা বেগম তার ছেলের তুলনায় একটু খাটো তাই কাব্যর হাত ধরে নিচে টেনে কপালে,গালে চুমু খেলেন। কাপাকাপা গলায় বললেন বুকে আয় বাপ।

মাকে বালিশে শুইয়ে মশারী টাঙিয়ে দিয়ে আশার সময় বাবাকে বললো,
সকালে তো দেখতে পাবো না, দেখতে বিকেল হবে আল্লাহ বাচাইলে।এই নাও পাঞ্জাবিটা বালিশের তলায় রাখো। দেখতে নতুন লাগবে। আমি তো দেখতে পাবো না, মানুষ দেখবে। আমি কিন্তু তোমার আর আমার পোশাকের ইস্ত্রির টাকা জমাচ্ছি। এবার ঈদের পাঞ্জাবি বানানোর টাকায় এই টাকা যোগ করবে।

বাবা উচ্ছাস বুকে নিয়ে চোখে পানি বের করে দিয়ে বলে, আমার অগোচরে তুই তোর মা আর তিন বোনকে এভাবেই আগলিয়ে রাখিস। কাব্য আচ্ছা, ইনশাআল্লাহ বলে বাতি বন্ধ করে চলে যায়।

হঠাৎ চোখ পরে কলের পাড় এ, এঁটো থালাগুলো এভাবেই পড়ে আছে। মা বোধহয় খেয়াল করেনি এটা ভেবে সে বসে পড়ে এগুলো ধোয়ার জন্য। ধোয়া শেষে নিজের চকিটা সুন্দর করে গুছিয়ে শুয়ে পড়ে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে,

বাবাকে এতো আবদার করলাম, বাবার আয়ের সাথে খরচটুকু মিলবে তো! নাকি বাবা পূরণ করতে না পেরে কষ্ট পাবেন। কাল বাবাকে ভালোভাবে বলবো। পুচকিটাকেও তো স্কুলে ভর্তি করতে হবে এটা নিয়েও কিছু বলা হলো না আজ।
খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে কাব্যর। মা’র জন্যেও বার্নল মলম কিনতে হবে, ইসস কিভাবে যে পড়লো তেল টা। ক্ষনে ক্ষনে জন্মদিনের চিঠির কথা সাজানোর কথাও ভাবতে থাকে। সে ভাবেঃ
গরীব ঘরে জন্মানোটা দোষের নয়,
জন্মের পর গরীব হওয়াটাই পরম দোষ।

এভাবেই কাব্যের পরিবার ও জীবন নিয়ে চিন্তা করতে করতে দৈনিক প্রহর গুলোর অবসান হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here