Home বইপত্র বুক রিভিউ: যদ্যপি আমার গুরু

বুক রিভিউ: যদ্যপি আমার গুরু

216
0

বুক রিভিউ: যদ্যপি আমার গুরু
লেখক: আহমদ ছফা
প্রকাশকাল:১৯৯৮
প্রকাশক: মাওলা ব্রাদার্স

আমরা জানি,হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন নিয়ে পানি গঠিত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন একত্রিত করলেই কি পানি তৈরি হবে? নিশ্চয়ই না।কারণ এর জন্য লাগবে উপযুক্ত পরিবেশ/প্রভাবক। এটা প্রায় অধিকাংশ বিক্রিয়ার ক্ষেত্রেই এমন।

একজন মানুষের জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রেও দরকার প্রভাবক বা উপযুক্ত পরিবেশ। এক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে থাকে শিক্ষক/গুরু।

বলা হয় সুগন্ধিপুষ্প শোভিত উদ্যানের মাটি থেকেও সৌরভ ছড়ায়। এখানে মাটি ফুলের সান্নিধ্যে বা সহবতে নিজেকে সুবাসিত করে তুলে।তাইতো একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায়, সক্রেটিসের সান্নিধ্যে প্লেটো, প্লেটোর সান্নিধ্যে এরিস্টটল, এরিস্টটলের সান্নিধ্যে আলেকজান্ডার এর মতো মানুষ গড়ে উঠেছিল। এই গুরু-শিষ্য যে সম্পর্ক সেটা অধিকাংশই নিরবে নিভৃতে হয়ে আসছে সেই আদিকাল থেকে।

“যদ্যপি আমার গুরু” বইটি তেমনই শিষ্য আহমদ ছফার হাতে রচিত তার গুরু অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের জীবনদর্শন।কিন্তু বইটির অনন্যতা দ্বিগুণ হয়ে উঠেছে যখন লেখক অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের উচ্চারিত বাক্যের শুধু প্রতিধ্বনি করেন নি, ব্যাখ্যা করেছেন,উপযুক্ত পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপন করেছেন,প্রয়োজনে প্রতিবাদ করেছেন।

অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক কে চলমান বিশ্বকোষ বলা হতো। অর্থশাস্ত্র,রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস,শিল্প-সাহিত্য,ধর্ম-সংস্কৃতি এই সব বিষয়গুলোর প্রতি ছিল উনার অগাধ জ্ঞান। সমকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পণ্ডিতমহল উনার মেধা ও ধী-শক্তির অনন্যতা স্বীকার করেন।
১৯৭০ সাল। এমএ ডিগ্রী না থাকা সত্ত্বেও আহমদ ছফা বাংলা একাডেমীর পিএইচডি ফেলোশিপ প্রোগ্রামে আবেদন করলেন এবং মনোনয়ন পেলেন। প্রয়োজন একজন অফিশিয়াল থিসিস সুপারভাইজার। বন্ধুদের পরামর্শে জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের বাসায় আহমদ ছফা। শুরু হলো এক নতুন অভিজ্ঞতার….

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডি.লিট প্রাপ্ত, হ্যারল্ড লাস্কির ছাত্র জ্ঞানকোষ অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের খাটি ঢাকাইয়া ভাষায় আহমদ ছফাকে দেওয়া প্রথম উপদেশ..
“যখন কোনো নতুন জায়গায় যাইবেন, দুইটা বিষয় পয়লা জানার চেষ্টা করবেন। অই জায়গার মানুষ কি খায়। আর পড়ালেখা কি করে। কাঁচাবাজারে যাইবেন, কী খায় এইডা দেখনের লাইগ্যা। আর বইয়ের দোকানে যাইবেন পড়াশোন কি করে, হেইডা জাননের লাইগ্যা।”

তিনি আহমদ ছফাকে প্রচুর বই পড়তে বলতেন। বই কিভাবে পড়তে হবে….

“আপনে যখন মনে করলেন, কোনো বই পইড়্যা ফেলাইলেন, নিজেরে জিগাইবেন যে-বইটা পড়ছেন, নিজের ভাষায় বইটা আবার লিখতে পারবেন কি না। আপনের ভাষার জোর লেখকের মতো শক্তিশালী না অইতে পারে, আপনের শব্দভান্ডার সামান্য অইতে পারে, তথাপি যদি মনে মনে আসল জিনিসটা রিপ্রোডিউস না করবার না পারেন, ধইর‍্যা নিবেন, আপনের পড়া অয় নাই।”

বইটিতে সমসাময়িক রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিখ্যাত মানুষদের সম্বন্ধে উনার যুক্তি সম্মত অভিমত এতো সুন্দর করে তুলে ধরা হয়েছে পাঠকহৃদয় প্রতিনিয়ত পরিতৃপ্তির রস অনুভব করবেন।

সমসাময়িক প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ,সাহিত্যিক,শিল্পী, সমাজসংস্কারক সবার সাথেই রাজ্জাক সাহেবের ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।

গুরু শিষ্যের আড্ডার গল্পে আপনিও ডুবে যাবেন সে গল্পের ভিতরে।

জসীমুদ্দীন কে নিয়ে গুরু শিষ্যের কথা উঠলে রাজ্জাক সাহেব বললেন…

“একসময় কলকাতায় আমি আর জসীমুদ্দীন এক বাড়িতে থাকতাম।একদিন জসীমুদ্দীন আমাকে কাপড়চোপড় পইর‍্যা তাড়াতাড়ি তৈয়ার অইবার তাগাদা দিতে লাগলেন। আমি জিগাইলাম, কই যাইবার চান। জসীমুদ্দীন কইলেন, এক জায়গায় জাওন লাগবো। কাপড়চোপড় পইর‍্যা তার লগে হাইট্যা হাইট্যা যখন এসপ্লানেডে আইলাম, জসীমুদ্দীন ঘাড় চুলকাইয়া কইলেন, কও দেখি এখন কই জাওন যায়? এইরকম কান্ড তিনি প্রায়ই করতেন।”

বঙ্কিম সম্বন্ধে রাজ্জাক সাহেবের মত ছিল এই…

“তার পড়াশোনা অইছিল মুসলমানের টাকায়। মুহসিন ফান্ডের টাকায় তিনি পড়াশোনা করছিলেন। আর মুসলমানের বিরুদ্ধে কলম ধইর‍্যা সেই ঋণ শোধ করছিলেন”

অবাক হতে হয় এই ভেবে গুরু শিষ্যের আলোচনায় কোনটা বাদ থাকতো!! বাংলার সুলতান থেকে শুরু করে জিন্নাহ, চর্যাপদ থেকে বর্তমান, বঙ্কিম থেকে টলস্তয়, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত থেকে বিথোভেনের মুনলিট সোনাটা, মার্কস থেকে স্মিথ, ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র থেকে সেকুলারিজম, লেনিন থেকে কিসিঞ্জার,এমন কোনো বিষয় নেই যেটা উঠে আসে নি। এমন কি সেখানে উঠে এসেছে অসংখ্য রেফারেন্স।

কিসিঞ্জার, সোহরাওয়ার্দী, এ.কে ফজলুল হক সহ বহু বিখ্যাত মানুষের সাথে মজার মজার ঘটনা পাঠককে হাসতে বাধ্য করবে।

আব্দুর রাজ্জাক সাহেব প্রায়ই আহমদ ছফা কে বলতেন
“আমরা শিক্ষকের প্রতি বছরই বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু প্রতিটি নতুন বছরে আমাদের কাছে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা এসে হাজির হয়। এই তরুণদের চাহিদা,চাওয়া-পাওয়ার খবর আমাদের মতো লোলচর্মের বৃদ্ধদের জানার কথা নয়। এটাই হলো শিক্ষক জীবনের সবচাইতে বড় ট্র্যাজেডি।”

কিন্তু আহমদ ছফা লক্ষ্য করতেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা বিভাগের দীপ্তিমান ছাত্রদের তিনি চুম্বকের মতো আকর্ষণ করতেন।

এই প্রবাদপ্রতিম মানুষ এতো বই পড়তে বললেও নিজে কখনো বই লিখেন নি। আহমদ ছফা জিনিসটাকে যুক্তিসহকারে বিশ্লেষণ করেছেন। সেই যুক্তিগুলো থেকে সামান্য একটা যুক্তি এই যে “রাজ্জাক সাহেব জাগতিক উন্নতির জন্য ভাবতেন না।সেসময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা বিষয়ে গবেষণা হয়েছে তার বেশিরভাগই চাকুরীর প্রমোশনের উদ্দেশ্যে লিখা।”

আরেকটি বিষয় হলো আহমদ ছফার কিন্তু পিএইচডি শেষ করেন নি…তার কারণ হয়তো এই….
“প্রথম লাইব্রেরি তে ঢুইক্যায় আপনার টপিকের কাছাকাছি যে বই পাওন যায়,পয়লা একচুটে পইড়া ফেলাইবেন। তারপর একটা সময় আপনি নিজেই পাইবেন আপনের আগাইবার পথ।”
আহমদ ছফা তার আগাইবার পথ পেয়ে গিয়েছিলেন হয়তো…

বইটি পাঠককে জ্ঞানের ক্ষুধা নিবারণ করার পাশাপাশি অন্তরে এক ধরণের তৃপ্তিরস সৃষ্টি করবে।

বইটি পড়ার অনুরোধ রইলো। অনেক কিছু নতুন ভাবে চিন্তা করাবে এই বইটি।

লেখকঃ মাকসুদুল হাসান আসিফ 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here