Home গল্প মিথ্যা সপ্ন

মিথ্যা সপ্ন

181
1

সোহানুর রহমান ( চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়)

মাথা টা ধরেছে আজ বড়। কফি খাওয়া দরকার। কিন্তু বিছানা থেকে উঠতে ইচ্ছে করছে না। দুপুরে শুলেই আলসেমি লাগে৷ ভাবছি কোনটিকে প্রাধান্য দেব? মাথাব্যথা নাকি আলসেমি নাকি বিছানা! ক’টা বাজে দেখা দরকার। ওমা এ দেখি সন্ধ্যে হয়ে এলো। নাহ এবার উঠতে হবে।
কফি খেয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। রাস্তায় ল্যাম্পপোস্ট গুলো খুব সুন্দর করে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ল্যাম্পপোস্টের আলো কোথায় গেল? খুবই অবাক করা বিষয়। হাঁটতে হাঁটতে পুরাতন থানার পাশ দিয়ে যাচ্ছি। ভাবলাম ওসি সাহেবের সাথে দেখা করে যাই। ওসি সাহেব খুব ভালো মানুষ না হলেও আমাকে স্নেহ করেন। একি থানা আছে অথচ কোনো পুলিশ নেই !! আমি নিজের শরীরে চিমটি কেটে দেখলাম না। কারণ এটা যদি সপ্ন হয় তাহলে ভেঙে যাবে। আর আমি তা চাই না। থানাটা ঘুরে দেখি। থানার ফাইলগুলো সুন্দর। চেয়ার, আলমারি বাহ! ওসি সাহেবের ডেস্কের ড্রয়ারে দেখি অনেক গুলো টাকা। কিন্তু ওতে আমার কাজ নেই। লকাপের ভেতর দেখি কে যেন বসে আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম,“কে ভাই?”
ভেতর থেকে কেউ একজন বললেন, – “ আমাকে চিনলেন না সাহেব !”
আমি বললাম, “ জ্বি না, চিনলাম না।”
সে বলল, “ আমার পরিচয় অনেক বড়। ধৈর্য এবং সময় দুটোই চাই আমাকে জানতে হলে। আপনার কাছে কি এই অমূল্য দুই রতন আছে?”
“হুম আছে। বলুন শুনি। আপনার ইতিহাস ”- বলে একটা চেয়ার টেনে বসলাম।
সে বলতে শুরু করল,“ আমি অনেক দিন যাবত এই জ্বেলে বন্দি। আমাকে আটকে রাখা হয়েছে। আমি থাকতাম নিজের বাসায়। খুব মজবুত করে তৈরি করা হয়েছিল আমার বাসা। খুব আনন্দে কাটছিল আমার দিনগুলো। প্রতিদিন আমি নতুন উদ্যমে বেড়ে উঠছিলাম৷ বেড়ে উঠছিলো আমার পরিধি। ”
আমি বললাম, “ভাই আপনার কথা বুঝতে পারছি না।”
সে বলল, “প্রশ্ন শেষে করবেন। এখন কোনো কথা বলবেন না।”
আমি বললাম, “জ্বি আচ্ছা।”
সে বলতে লাগল,“ আমার উন্নতির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে আমার দুই সন্তান। ১ম জন আমাকে খারাপ ভালো দুই দিকেই অগ্রসর করতো আর ২য় জন আমাকে প্রতিটি মুহূর্তে উন্নতির দিকে নিয়ে যেত। আমার ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল জ্ঞান দ্বারা। এই জ্ঞান ছিল সাহিত্য কেন্দ্রিক, বিজ্ঞান কেন্দ্রিক, নৈতিকতা কেন্দ্রিক। তাই সবাই আমাকে অর্জন করতে চাইতো।
এক সময় আমার ১ম সন্তান বদলে গেল। সে এমন ভাবে বদলে গেল যে তাকে ফেরানো সম্ভব হচ্ছিল না। সে খারাপ হয়ে উঠল। তখন আমার ২য় সন্তান আমাকে আগলে রাখার চেষ্টা করল। কিছু দিন পর সে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। আমি শোকে পাথর হয়ে রইলাম কিছুকাল। তার পর আমি আমার ভিত্তিগুলো ভেঙে ফেললাম। আমি হারিয়ে ফেললাম আমার জ্ঞান। কিছু অপশক্তি চার পাশ থেকে আমাকে ঘিরে ফেলেছিল। তাই আমি আর কোনো পথ না পেয়ে পালিয়ে চলে আসলাম এইখানে। এই জেলে যেখানে কোনো মানুষ আসে না। আমি একাই থাকি।”
আমি কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে রইলাম। এই লোক কি বলতেছে এই সব। আমার মনে অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। তাই জিজ্ঞাসা করলাম, “ ভাই আপনার মাথা ঠিক আছে তো? ”
তিনি বললেন,“ জ্বি।”
আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম,“ আপনি বললেন কিছু অপশক্তি আপনাকে ঘিরে ফেলেছিল, এরা কারা?”
তিনি উত্তর করলেন,“ লোভ, অন্যায়, দুর্নীতি, ব্যভিচার, নির্মমতা।”
আমি পুনরায় জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনার ভিত্তি সমূহ ভেঙে পড়ছিল কেন?”
তিনি উত্তর দিলেন,“ কারণ আমি যেখানে বসবাস করতাম সেখানে লোভ, অন্যায়, দুর্নীতি, ব্যভিচার ও নির্মমতা প্রবেশ করেছিল। তাই সেখানে জ্ঞান চর্চা হতো না। তাই আমার ভিত্তি ভেঙে পড়ে।”
“আপনার দুই সন্তানের নাম কি কি?” জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
তিনি বললেন,“ ১ম জন সময় এবং ২য় জন ধৈর্য। সময় বদলে গিয়ে খারাপ হয়ে গেল। ধৈর্য কিছুকাল থেকে গায়েব হয়ে গেলো। সময় এবং ধৈর্যের অভাবে আমি জ্ঞান সাধনা থেকে বিরত থাকলাম। এবং ভুলেও গেলাম পূর্বের জ্ঞান৷ তাই লোভ, অন্যায়, দূর্নীতি, ব্যভিচার ও নির্মমতা আমায় পেয়ে বসল। তাই আমি পালিয়ে এলাম।”
আমি শেষ প্রশ্নটি তাকে করলাম, “ ভাই আপনার নাম?”
তিনি বললেন, “আমি সুবোধ।”
ঘুম ভেঙে গেল। মনে হলো যাকে জেলে পাঠিয়ে দিয়েছি তাকে ফিরিয়ে আনা দরকার৷ আর কতো পালিয়ে বেড়াবে সে। সুবোধ তুই আর পালাসনে এবার ফিরে আয়। মনে এলো সুবোধ বলেছিল সময় এবং ধৈর্য প্রয়োজন, সেই সাথে প্রয়োজন সাহিত্যিক, নৈতিক এবং বিজ্ঞান বিষয়ক জ্ঞান। তবেই সুবোধ ফিরবে৷ আর সুবোধ ফিরলে দূর হবে লোভ, দূর্নীতি, ব্যভিচার, নির্মমতা। তবে তাই হোক। আবার ফিরে আসুক সুবোধ।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here