Home সম্পাদকীয় রেসিজম কি? আমরা কি ভাবি? || মুসোবিহা

রেসিজম কি? আমরা কি ভাবি? || মুসোবিহা

307
0

কিন্ডারগার্টেনে পড়াশুনাকালীন আমার শখ জেগেছিলো বড় হয়ে সামরিক বাহিনীতে যাওয়ার। কিন্তু একটু বড় হয়ে যখন দেখলাম সেই অনুযায়ী “বড়” হচ্ছি না, তখন আশা বদলাতে হলো। বর্তমানে আমি ৫’২” বা এর আশেপাশে উচ্চতার একজন ছেলে। মানুষের উচ্চতা জিনগত এবং পরিবেশগতভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। সে হিসেবে খাটো হওয়ার পেছনে আমার দায়বদ্ধতা খুব একটা উল্লেখযোগ্য না। এখন আমাকে যদি বহু আকাঙ্খিত সামরিক বাহিনী তাদের দলে গ্রহণ না করে তাহলে সেটা কি রেসিজম হবে? উত্তর অবশ্যই না।

সম্প্রতি আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ এক ব্যাক্তিকে অনাকাঙ্খিত হত্যার ব্যাপারকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে “রেসিজম” নিয়ে অনেকের অনেক আক্ষেপ, হতাশা কিংবা ধিক্কার প্রকাশিত হচ্ছে। তার মধ্যে অনেকেই মনে করে ফেলেছেন, যারা বিয়ের সময় ফর্সা চামড়াকে প্রাদান্য দেয় তারা রেসিজম নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশের অধিকার রাখে না বা এই জাতীয় কিছু। আসলে এমন ধারণাও খুব একটা সঠিক নয়।

একজন মানুষের গায়ের বর্ণ, উচ্চতা, ধর্ম কিংবা সংস্কৃতি অধিকাংশ সময়ই তার জাতীয় বা নৃতাত্ত্বিক উৎসের কারণে নির্ধারিত হয়ে থাকে। এ কারণে যদি আমি তাকে বিয়ে করতে আগ্রহবোধ না করি তাহলে সেটা ততক্ষণ পর্যন্ত রেসিজম হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না আমার মনে তার প্রতি ঘৃণা বা হেয় প্রতিপন্নভাব জন্মায়। উদাহরণ হিসেবে ধরুন, আপনি সব সময় বসুন্ধরা শপিং মল থেকে কেনা কাটা করে থাকেন, এটা আপনার ব্যাক্তিগত সাচ্ছন্দবোধ রেসিজম না। কিন্তু যখনই আপনি নিউমার্কেট থেকে কেনাকাটা করাকে ছোটলোকি ভেবে ফেলবেন তখন এটা হবে রেসিজম।

এবার একটু পুস্তকীয় ব্যাখায় আসা যাক। এই অংশটা বিরক্তিকর হলেও আমার মনে হয় জানা উচিৎ।

ইংরেজি race শব্দটি থেকে Racism শব্দটি এসেছে। ইংরেজিতে race অর্থ হলো জাতি, বংশ, গোত্র ইত্যাদি। ১৯৩৩ সালে প্রথম racism শব্দটা ব্যবহার হয়। Racism বলতে আমরা স্বাভাবিকভাবে “বর্ণবাদ” বুঝলেও এই অর্থটা আসলে এর পরিপূর্ণ ভাব প্রকাশ করতে পারে না। সেজন্য অনেকেই মনে করেন এর সঠিক অর্থ হলো “শ্রেণীবৈষম্য”। পারিভাষিক দিক থেকে বলা যায় “এই বিশ্বাস যে জাতি/বংশ হচ্ছে মানবিক বৈশিষ্ট্য (human traits) এবং ক্ষমতার প্রাথমিক নির্ধারক (determinant) এবং এই জাতিগত পার্থক্য কোন নির্দিষ্ট জাতির শ্রেষ্টত্ব তৈরি করে।” অর্থাৎ, রেসিজম এক ধরণের বিশ্বাস এবং এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী মানুষকে বলা হয় রেসিস্ট।

রেসিজম বিভিন্ন ধরণের হয়ে থাকে। Monash University এর ওয়েবসাইট এ Forms of Racism হিসেবে প্রকারগুলো এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে –

(1) Individual or interpersonal racism অর্থাৎ ব্যক্তিগত বা সামাজিক শ্রেণীবৈষম্য।

ব্যাখ্যাঃ রেসিজম সর্বদা ক্ষতিকর বা সচেতনভাবে বিদ্বেষপরায়ণ হতে নাও পারে। কিন্তু এটি উপহাস বা খারাপ মন্তব্যের মধ্য দিয়ে অন্যান্য জাতির মধ্যে নেতিবাচক বাধাধরা তৈরি করে। এধরণের শ্রেণীবৈষম্য আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

উদাহরণ –

১| নির্দিষ্ট কোন সম্প্রদায়ের সাথে যোগাযোগ এড়িয়ে চলা।
২| কোন রাজনৈতিক দল বা কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়কে আক্রমণাত্মক কৌতুক, পোস্টার।
৩| নাম বিকৃত করে ডাকা, গালাগালি, হুমকি ইত্যাদি।
৪| ভিন্ন বিশ্বাসের কারণে কোন ব্যাক্তিকে হত্যা বা তার সাথে জঘন্য অপরাধ করা।
৫| বিশেষ সম্প্রদায় সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করে এমন ধরণের মন্তব্য।

(2)Institutional or systematic racism বা প্রাতিষ্ঠানিক অথবা রীতিবদ্ধ শ্রেণীবৈষম্য।

ব্যাখ্যাঃ কোন প্রতিষ্টানে বা সমাজ ব্যবস্থায় যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ তারা স্বাভাবিকভাবেই সুযোগ-সুবিধা বেশি পায়। আর যারা সংখ্যালঘু তারা অসুবিধায় থাকে। এটা ইচ্ছাকৃত হতে পারে আবার অনিচ্ছাকৃতও হতে পারে।

উদাহরণ –

১| নির্দিষ্ট পন্থায় কোন নির্দিষ্ট গোত্রের সদস্যদেরকে একটি বাঁধাধরা বা অপরিবর্তনীয় ছাঁচে নিয়ে আসা।
২| কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের লোকদেরকে তাদের প্রয়োজনীয় সেবা দিতে ব্যর্থ হওয়া বা প্রত্যাখ্যান করা কিংবা সাংস্কৃতিক ভাবে অনুপযুক্ত (culturally inappropriate) সেবা প্রদান করা।
৩| কোন এক বিশেষ সম্প্রদায়ের ব্যক্তিকে তার রীতিনীতির বাইরে আগ্রহী নয় এমন কোন অবস্থানে কাজ দেওয়া যার কারণে কর্তপক্ষ তাদের প্রমোশন, পেশাদারি উন্নয়নমূলক সুযোগ দিতে ব্যর্থ হয়।
৪| গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পার্থক্যকে অবজ্ঞা করা,যা শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় প্রভাব ফেলতে পারে।

(3) Cultural racism তথা সাংস্কৃতিক শ্রেণীবৈষম্য।

ব্যাখ্যাঃ প্রভাবশালী বা সংখ্যাগুরুদের সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক, আকাঙ্ক্ষিত হিসেবে দেখা। সংখ্যালঘুদের সংস্কৃতিকে, আচারকে গুরুত্বহীন, নিকৃষ্ট এবং অদৃশ্য হিসেবে গণ্যকরা।

উদাহরণ –

১| বিজ্ঞাপনে শুধুমাত্র শ্বেতাঙ্গদের সৌন্দর্যের মাপকাঠি হিসেবে represent করা।
২| বিভিন্ন সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ এবং অবদান কে উপেক্ষা করা।
৩| গণমাধ্যম যেমন টেলিভিশন এবং চলচিত্রে শুধমাত্র শ্বেতাঙ্গ চরিত্রকে দিয়ে অভিনয় করানো।
৪| সংখ্যালঘুদের সৌন্দর্যবর্ধক এবং স্বাস্থ্য সমগ্রীর অভাব। যেমন কালো চামড়ার মানুষের জন্য ডার্কার স্কিন টোন দরকার হয় কারণ তাদেরকে ফেয়ার এন্ড লাভলী দিয়ে ফর্সা করা সম্ভব নয়।
৫| সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভাষা ব্যবহারের দূরাশা পোষণ করা। যেমন অনিচ্ছা সত্যেও আমাদের এমন ভাষা শিখতে হয় যেটা না শিখলে কর্মজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
৬| সংখ্যাগরিষ্ঠ বা প্রভাবশালীদের মত পোশাক পরিধানের দূরাশা পোষণ করা। যে কারণে ফর্মাল ড্রেস হিসেবে আমরা পশ্চিমা পোষাককেই বিবেচনা করে থাকি।

(4) Internalized racism বা অন্তরীণ শ্রেণীবৈষম্য।

ব্যাখ্যাঃ এটা হচ্ছে রেসিজমের চূড়ান্ত পর্যায়। এই অবস্থায় মানুষ রেসিজমকে বৈধ বিশ্বাস করতে শুরু করে। আর এই বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে সে কোন গোষ্ঠির প্রতি বিদ্বেষমূলক কথা বলে, ঘৃণা প্রকাশ করে, সন্দেহ, হতাশা প্রকাশ করে।

উদাহরণ –

১| কারো সম্প্রদায়ের উপর রাগ, ঘৃণা, ধিক্কার প্রকাশ করা।
২| সমালোচনার মাধ্যমে কোন সম্প্রদায়কে বিভেদ-অনৈক্যের দিকে নিয়ে যাওয়া।
৩| কোন গ্রুপের সদস্য, যে নেতৃত্ব দেয় তাকে, আক্রমণ করা, সমালোচনা করা, কুৎসা রটানো।
৪| কারো সম্প্রদায় সম্পর্কে লজ্জ্বা অনুভূত করা। যেমন শ্বেতাঙ্গদের গায়ের রঙ, পোষাক, সংগীত, ভাষা এগুলোকে স্ট্যান্ডার্ড বিবেচিত করে অন্যদের ছোট ভাবা।

শেষের উদাহরণটা আমার কাছে এই মুহূর্তে অনেক বড় সমস্যা মনে হয়েছে যেটা বরাবরের মত আমাদের নজর এড়াতেও সামর্থ্য হচ্ছে। আমার কথাটা “মেক আপ” নিয়ে। যে মানুষটা নিজে ফর্সা বলে কালো মানুষকে উপহাস করে তার রেসিজম আমরা সবাই ধরতে পারি। কিন্তু যে মানুষটা নিজের বর্ণ কিংবা চেহারার গড়ন নিয়ে অসন্তুষ্ট বলে সেটাকে ঢেকে দিতে মেক-আপ গ্রহণ করে তার মানসিক রেসিজমটা আমরা খুব একটা ধরি না। এইদিক থেকে বিবেচনা করলে নিজের চেয়ে তথাকথিত স্ট্যান্ডার্ড কেউ কি দেখতে চায় বা কিসের মূল্যায়ন বেশি করে সেটার গ্রহণযোগ্যতা আমাদের কাছে বেশি।

একজন মানুষ ব্যাক্তিগত সাচ্ছন্দের জন্য চেহারায় মেক-আপ কিংবা ছবিতে ফিল্টার ব্যাবহার করতেই পারেন। কেউ পছন্দের কারণে আর্টস, কমার্স রেখে সাইন্স বিষয়ে পড়তেই পারেন কিংবা ব্যাক্তিগত পছন্দের কারণে হাই-হিল জুতা ব্যাবহার করতেই পারেন তাতে শুধু আমার কেন, কারোরই কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু কেউ যদি নিজের এতটুকু হীনমন্যতার কারণে এসব করে থাকে তাহলে সেও রেসিসস্ট, তারও উচিৎ নিজের মানসিকতার পরিবর্তন করা।

আমি এই লেখাটার বড় একটা অংশ জেনেছি আসিফ আলভী’র একটা নিবন্ধ থেকে। তিনি নিবন্ধটি শেষ করেছিলেন রেসিজমের বিরুদ্ধে রবার্ট মুগাবের একটি ঐতিহাসিক বক্তব্য দিয়ে। আমিও তাই করছি –

“রেসিজম ততদিন পর্যন্ত শেষ হবে না, যতদিন পর্যন্ত- সাদা গাড়িতে কালো টায়ার ব্যবহার করা হবে, কালোকে দুর্ভাগ্যের আর সাদাকে শান্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হবে, বিয়ের পোশাক হিসেবে সাদা পোশাক আর শবযাত্রার জন্য কালো পোষাক ব্যবহার করা হবে, কর পরিশোধ করতে ব্যর্থদের সাদা তালিকাভুক্তির পরিবর্তে কালো তালিকাভুক্ত করা হবে, এমনকি স্নুকার খেলার সময়ও সাদা বলটা টেবিলে রেখে কালো বল গর্তে ফেলে বিজয় নিশ্চিত করতে হবে। তবে যতদিন পর্যন্ত আমি আমার কালো পশ্চাৎদেশ মুছতে সাদা টয়লেট পেপার ব্যবহার করতে পরছি ততদিন পর্যন্ত এটা (রেসিজম) নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যাথা নেই; আমি বেশ আছি।” – রবার্ট মুগাবে

 

লেখাঃ মুসোবিহা, প্রধান নির্বাহী সম্পাদক, ফানুস ‘৭১। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here