Home প্রজন্ম শুশুকের আর্তনাদ -নুসরাত জাহান

শুশুকের আর্তনাদ -নুসরাত জাহান

71
0

দেখতে দেখতে ৩ বছর পেরুলো, সমুদ্রের ফেনার মতোই ভেসে চলছি জাহাজে, এদেশ হতে ওদেশ, জলে ভাসতে ভাসতে এই সমুদ্রের সাথে এক নিরবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক এ জড়িয়ে গেছি। মাঝেমাঝে খেয়ালী ইচ্ছের মতো নীল রং এর এই জলে কারো ছায়া দেখতে পাই।
মুহুর্তেই আবার ব্যস্ত জাহাজের অপার ভূমে ফিরি।
এই জীবন কার?

বিনোদপুর গ্রামের একটা বিশাল মাঠ ছিলো, বিদ্যানন্দ স্কুল মাঠ, সারাটা বিকেল পশ্চিম বাড়ির বল্টু হাসানদের সাথেই খেলে কাটাতাম, আচ্ছা বল্টু শেষ যে শহরে গিয়েছিলো আর কি ফিরেছিলো? হাসান শুনেছি শহরে ছোটখাটো একটা চাকুরী করে, নারকেলের ডগা দিয়ে ক্রিকেট ব্যাট সবাই টাকা জমিয়ে বল, এই দিনগুলো কেন চলে গেছে আর ফিরবে না?

বাড়ির  দক্ষিনে একটা বিশাল বট গাছ ছিলো, লোকে বলত এই গাছে নাকি ভুত আছে, কতই না ইট পাটকেল মারতাম ভুতের গায়ে,কত খেলে আমি শিপলু বল্টু গাছেই ঘুমিয়ে পড়তাম।
এর একটু দূরেই ছিলো কাজলা দিঘী, সমুদ্রে সমুদ্রে ঘুরছি, কত দেশে গিয়েছি কিন্তু এই দিঘীর জলের মতো স্বাদ কোথাও পাইনি,
সতত হে দিঘী তুমি পড় মোর মনে, পাশেই ছিলো জারুল গাছ, কত পাখির বাচ্চা ধরতে সেই জারুল গাছে উঠেছিলাম, আচ্ছা এই সমুদ্রের মাঝে ভেসে ভেসে স্মৃতিরা আসে খুব কাছে,

এস এস সি শেষ করেই চলে আসলাম শহরে, শহরের পড়াশোনা পরিবেশ সব কেমন জেনো , বন্দী বন্দী লাগত তাও শহরের স্মৃতিগুলোও কম ভাবায় না, মঈনুল নামে খুব ভালো এক বন্ধু হয়ে যায় আমার, মঈনুল এর বাড়িতে প্রায় যেতাম, মঈনুলের একটা ছোট বোন ছিলো দু বছরের ছোট লাবন্য, কখনো কথা হত না বাট ও আমাকে আড়াল থেকে দেখতো, এখন ভাবি মাঝেমাঝেই লাবন্য কি আমাকে ভালোবাসতো, সেই মঈনুল এখন আর্মিতে আছে, অনেকদিন হল যোগাযোগ নেই, লাবন্যই বা কই, হয়তো কাউকে বিয়ে করে সুখেই আছে।

এই জাহাজের নাবিকের জীবন আর করদিন,  এই জীবন এর সাথে সাধারন মানুষের জীবনের যে পার্থক্য তা কি কেও কি বোঝে,মাঝসমুদ্রে জোছনার ছায়ায় জীবনের এক ঘুর্নায়মান সন্ধি,
মনে পড়ে বাবা মায়ের ভালোবাসা, দিনু তনুর ভাইয়া ডাক , আহ জীবন, ভাসমান এক খেয়া

বাবা মা তোমাদের স্মৃতি এতটাই কাঁদায়  বোঝাতে পারব না, ছোটবেলায় তুমি কাধে করে বাজারে নিয়ে যেতে, আর শহরে আসার পর কেমন জানি একটা অদৃশ্য দূরত্ব এলো, তাও আমার মাথা ফেটে যাওয়ার দিন তুমি হাসপাতালে কাঁদছিলে আমি দেখেছি, বাবা আমি আবার তোমার সাথে রাংগুলি মেলা যেতে চাই, লজেঞ্জ আইসক্রিম খেতে খেতে বাড়ি ফিরতে চাই। বাবা এখনো বুড়ো হয়ে গিয়ে তুমি ঠিকঠাক হাটতে পারো তো?মা তুমি কি এখনো প্রতিদিন মাঝরাতে আমার ঘরে আসো? প্রতিদিন মাঝরাতে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে, আমি এখনো ঘুমাতে যাই শুধু মাথায় হাতটুকু ছোয়া পাই না, মা তোমার হাতের ট্যাংরা টমেটোর ঝোল এখনো করো তাই না, আমি আবার কবে ভাত দিয়ে খাবো।
মা জানো তোমাকে কোলে আমার ঘুমোতে খুব ইচ্ছে করে কিন্তু এই বিশাল সাগরের অকুল পাথারে আমি এক সামান্য নাবিক

সমুদ্র আর নীল জোছনা যেনো এক দূরত্ব প্রেমের গল্প আমি বিবাদ বিচ্ছেদ এর বিষন্ন যাত্রাপথে অপার মুগ্ধতা নিয়ে অবলোকন করি। কলেজ জীবনে নীতুর কথা আমার খুব মনে পড়ে, নীতু যেদিন বসন্ত বরনে শাড়ি পড়ে কলেজে এসেছিলো সেইদিন মনে হয়েছিলো সত্যিই কোনো পরী, আচ্ছা নীতুর প্রতি আমার কি কোনো অনুভূতি ছিলো, কই সেই নীতু, কোথায় আছে কে জানে

এই একাকী জীবনে এত ব্যস্ততার মাঝে এই সমুদ্র জলই যেনো একমাত্র কেও, বিনীদ্র রজনীর সেই বিভিষীকাময় ব্যাথায় পরিবার পরিজন নিতান্তই প্রিয়জন ছেড়ে, সমুদ্রেই যার প্রতিটা সূর্যোদয় সমুদ্রেই যার নিশীথযাপন, তীর হারা এক বেহমিহান জীবন।

স্যার স্যার  বন্দরে পোঁছাইয়া গেছি, আফনে সাইন করতে  না আসলে মালামাল নামামু কেমতে? ঘোর ভেংগে গেলো ফিরে এলাম আবার নিজের জীবনের গতিতে…… মনে হল আহারে জীবন আহারে জীবন জলে ভাসা পদ্ম যেনো


LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here