চরম অর্থনৈতিক সংকটে পাকিস্তান

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আরও বেশ কিছু দিন চললে পাকিস্তানের মতো গরিব দেশগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয় হবে। চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়বে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি। নিউ ইয়র্কের জেপি মরগান চেস অ্যান্ড কো-র আশঙ্কা, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিয়ে রাশিয়া যদি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি রফতানিতে কাটছাঁট করে তাহলেই চরম সংকট দেখা দিতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিদিন ৩ মিলিয়ন ব্যারেল সরবরাহ ছাঁটাই করলেই লন্ডনে অপরিশোধিত তেলের দাম দাঁড়াবে ১৯০ মার্কিন ডলার। আর সেটা ৫ মিলিয়ন হলেই ব্যারেল পিছু জ্বালানির দাম ৩৮০ ডলার হতে বাধ্য। আর সেটা হলে পাকিস্তানের অবস্থা শ্রীলঙ্কার থেকেও খারাপ হবে।

অর্থনৈতিক বিভিন্ন উপাত্ত অনুসারে, এখনই ধুঁকছে ইসলামাবাদ। তাদের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এলএনজি লিমিটেড ইতোমধ্যে জ্বালানির দামবৃদ্ধির কারণে জুলাই মাসের একটি দরপত্র বাতিল করেছে। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশ এখনও তার দরপত্র অনুসারে জ্বালানি ক্রয় স্বাভাবিক রেখেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় খোলা বাজার থেকে জ্বালানি আমদানির পরিমাণ কমালেও কোনও দরপত্র বাতিল করতে হয়নি আমাদের।

ইসলামাবাদের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা দুশ্চিন্তার আরেকটি কারণ। আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস, কারেন্ট অ্যাকাউন্টের বিশাল ঘাটতি এবং মুদ্রার অবমূল্যায়ন, এগুলো উদাহরণ মাত্র।

গত বছরের তুলনায় ৫৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে পাকিস্তানের চলতি আর্থিক বছরে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ৪৮.৬৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। শাহবাজ শরীফ সরকার মে মাসে ৮০০টিরও বেশি ‘অপ্রয়োজনীয়’ বিলাসবহুল সামগ্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেও বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ কমাতে পারেনি। ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও অন্যান্য সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি আরও তছনছ করে দিয়েছে পাকিস্তানের অর্থনীতি।

অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝড়ো হাওয়ার প্রভাব লেগেছে বাংলাদেশের অর্থনীতির হালে। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশই রয়েছে তার অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণে।

ইকোনমিকস টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে, করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক অবস্থা মোকাবিলায় নিজের স্বতন্ত্রতা প্রতিষ্ঠা করেছে বাংলাদেশ। জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বিশ্বের অনেক দেশকে তাক লাগিয়ে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে ধুঁকতে থাকা ইউরোপের দেশগুলোর তুলনায় এখনও নিজের অবস্থানে পাকাপোক্তভাবে রয়ে গেছি আমরা। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ আমাদের প্রতিটি মেগা প্রজেক্ট লাভজনক। আর এখানেই শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের সঙ্গে মূল পার্থক্যটি গড়ে দিয়েছে বাংলাদেশ।

মেগা প্রকল্প হিসেবে বহুল চর্চিত চীন পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর (সিজিইসি) ইসলামাবাদের অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটানোর বদলে আরও বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনা সংস্থাগুলো পাকিস্তানের রাজস্বে থাবা বসালেও বিদ্যুৎ মিলছে না সাধারণ মানুষের। গত চার বছর ধরে বেইজিং-এর ‘হচ্ছে-হবে’ মনোভাব পাকিস্তানের বিদ্যুৎ পরিস্থিতিকে আরও বেহাল করে তুলেছে। যন্ত্রপাতি কিছু আনা হলেও সেগুলো কাজে লাগানো হচ্ছে না। এই সংকটে তাদের এই বড় সব প্রকল্পের খরচ উঠে আসা তো দূরের বিষয়, বরং ঠিকমতো প্রকল্প পরিচালনা নিয়েই দেখা দিয়েছে সংশয়। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি চীনা সাহায্যপ্রাপ্ত পাকিস্তানই এখন সবচেয়ে দুর্ভোগে রয়েছে।

জুন মাসে পাকিস্তান সমস্ত রেকর্ড ভেঙে মুদ্রাস্ফীতির হার ২০ শতাংশ ছাড়ালে ইন্টারন্যাশনাল মনিটরি ফান্ড (আইএমএফ) জ্বালানির দাম লিটার পিছু ৫০ রুপি বাড়ানোর পরামর্শ দেয় পাকিস্তানকে। মাত্র ৩৩ দিনে পেট্রোলের দাম ১৪৯ থেকে বেড়ে ২৪৯ রুপিতে পৌঁছায়। একই সঙ্গে বাড়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দামও। কিন্তু দাম বাড়লেও গোটা পাকিস্তান বিদ্যুতের অভাবে ধুঁকছে। মুদ্রাস্ফীতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটা ভাবতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরাও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন।

এদিকে, পাকিস্তানে অত্যাবশ্যকীয় আমদানি করতে গিয়েও বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাকিস্তানে রান্নার তেলের আমদানি মূল্য ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে গত অর্থবছরের তুলনায় ৪৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৩.৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বাজারে ২০১৯ সালের প্রতি লিটার ২০০ রুপির ভোজ্য তেল এখন বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ রুপিতে। স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের মতে, ‘গত দুই দশক ধরে দেশীয় চাহিদা মেটাতে ভোজ্যতেল এবং তৈলবীজ আমদানির ওপর পাকিস্তানের নির্ভরতা বাড়ছে। ২০০০ সালের ৭৭ শতাংশ ভোজ্য তেলের আমদানি নির্ভরতা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬ শতাংশ।’

বিশ্লেষকদের মতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চাহিদা। কিন্তু তেল ও তেলবীজ উৎপাদনে পাকিস্তানের ব্যর্থতা সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

পাকিস্তানের প্রখ্যাত ব্যাংকার ইউসুফ নাজারের মতে, ইসলামাবাদ অন্য যেকোনও দেশের চেয়ে বেশি আইএমএফ বেলআউট প্যাকেজ পেয়েছে। এতেই বোঝা যায় পাকিস্তানের চিরকালই বহিরাগত খাত দুর্বল ছিল। সামরিক বা অসামরিক কোনও সরকারই দেশীয় অর্থনীতির মৌলিক ত্রুটি সংশোধনের চেষ্টা করেনি। সরকারের দেওয়া প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে বিভ্রান্তিকর। রফতানি, বিনিয়োগ এবং সঞ্চয়কে গুরুত্ব না দিয়ে আমদানি ও প্রবৃদ্ধি ভোগের ওপর নির্ভরশীলতা পাকিস্তানকে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

পাকিস্তানের অর্থনীতি এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে যে তাদের বন্ধু দেশগুলোও এখন আর বেলআউটের পুরনো গল্প শুনতে নারাজ। কারণ, তারা বুঝে গিয়েছে আপাদমস্তক ঋণে জর্জরিত পাকিস্তান। তাই বেলআউট প্যাকেজেরও সম্ভাবনা সংকুচিত হচ্ছে। আগে যেখানে পাকিস্তান ঋণদাতাদের কাছে ৫-১০ বছর সময় পেতো, এখন সেখানে ২-১ মাসের মধ্যেই ঋণ পরিশোধের শর্ত মিলছে তাদের।

পক্ষান্তরে বাংলাদেশ এখনও ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্ব অর্থনীতির মোড়লদের প্রশংসায় ভাসছে। বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অভ্যন্তরীণ যে শক্তির পরিচয় বাংলাদেশ দিয়েছে, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সকলে।

পাকিস্তানের আসলে গোড়াতেই গলদ রয়েছে। সঙ্গে রয়েছে অযোগ্য ও অদক্ষ নেতৃত্ব এবং ব্যাপক দুর্নীতি। আইএমএফ পাকিস্তানকে দুর্নীতি দমনে টাস্কফোর্স গঠন করতে বলেছে। সরকারি দফতরে দুর্নীতি দমনে কড়া আইন তৈরিরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কিছুই হয়নি। গত ১৩-১৪ বছরে পাকিস্তানের রেল, ইস্পাত কারখানা, বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় ক্ষতির বহর বেড়ে চলেছে।

রফতানি থেকে জিডিপি অনুপাতের মারাত্মক হ্রাস বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়িয়েছে পাকিস্তানে। রিয়েল এস্টেটের ব্যবসাতেও মন্দা দেখা দিয়েছে। কারণ, আর্থিক দিক থেকে সচ্ছলরাও বাড়িঘর নির্মাণে উৎসাহিত নন। বেসরকারি ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থানের তেমন সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। বরং অপরাধমূলক কাজকর্ম লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাত থেকে শুরু করে সকল সূচকে পাকিস্তান তলানিতে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের শোষণ থেকে স্বাধীনতা লাভ করা বাংলাদেশ অর্থনৈতিক, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়নসহ সকল খাতে এখন এক দৃষ্টান্তের নাম। বিশ্বের অনেক সংস্থাই আফ্রিকা ও এশিয়ার ছোট দেশগুলোকে ‘বাংলাদেশ মডেল’ অনুসরণের পরামর্শ দেন।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে পাকিস্তানকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, দেশটিতে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। কারণ, একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই প্রতি বছর গড়ে ১৬-২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার তাদের ঘাটতি থাকছে। মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য করার পর, এই সময়ের মধ্যে মাথাপিছু গড় আয় ২ শতাংশ কমেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অতীতের তুলনায় আরও কমেছে জাতীয় উৎপাদন ক্ষমতা। কাঠামোগত ঘাটতিগুলোও বেশি করে সামনে চলে আসছে। বর্তমানে আইএমএফ বেলআউট প্যাকেজ থাকলেও বড় কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে চলছে ইসলামাবাদ। এর জন্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ৭০ বছর ধরেই দেশটি খুব খারাপভাবে পরিচালিত হয়েছে। অত্যধিক চীন নির্ভরতা এবং জঙ্গিবাদীদের প্রতি নরম মনোভাব দেশটিকে আর্থিক দিক থেকে দিন দিন পেছনে নিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে রয়েছে লাগামহীন দুর্নীতি। ফলে আগামী দিনে আরও বড় দুর্ভোগের আশঙ্কা রয়েছে পাকিস্তানি জনগণের।

বিগত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি রয়েছে পাকিস্তানের। দেশটির বর্তমান মূল্যস্ফীতি ২১.৩ শতাংশ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দেশটিতে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের অভাব ভোগাচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এখান থেকে উত্তরণের জন্য কোনও রূপকল্পও ঘোষণা করেনি পাকিস্তান সরকার। সব মিলিয়ে এভাবে চলতে থাকলে পাকিস্তানের অবস্থা শ্রীলঙ্কার থেকেও খারাপ হবে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ সেখানে দক্ষিণ এশিয়ার এক সফলতার গল্প। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ার ‘টাইগার ইকোনমি’। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে আমরা। বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলার সাহস রাখে না কেউ। দেশের তারুণ্যের ওপর নির্ভর করে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। ১৯৭১ সালে যেই বাংলাদেশকে ধ্বংস করার জন্য তার সমস্ত রিজার্ভ চুরি করে নিয়ে যায় পাকিস্তান; যেই দেশকে মাথা তুলে দাঁড়াতে না দেবার দৃঢ় প্রত্যয় থেকে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর হত্যা করা হয় সেরা সন্তানদের; সেই পাকিস্তান আজ ধুঁকছে তার সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি, লুটপাট এবং অপরাধবোধ নিয়ে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ঠিকই ঘুরে দাঁড়িয়েছে তার অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে। আজ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে বাংলাদেশ যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা থেকে পাকিস্তানের শিক্ষা নেওয়া উচিত।

লেখক:
ফারাজী আজমল হোসেন
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!