Home গল্প ফ্যান ফিকশনঃ গিরিডিতে গ্যাঁড়াকল (পর্ব-১) || কৃষ্ণকলি

ফ্যান ফিকশনঃ গিরিডিতে গ্যাঁড়াকল (পর্ব-১) || কৃষ্ণকলি

47
1
কোন মানে হয় মশাই! রোববারের সকালটা আপনার জন্যেই তোলা থাকে, আর আপনিই কিনা এমন ম্যাদামারা হয়ে বসে আছেন। হ্যাঃ!’ ঠকাশ করে চায়ের কাপটা সামনের ছোট টেবিলটায় রেখে বললেন বিখ্যাত রহস্য-রোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক লালমোহন গাঙ্গুলী ওরফে জটায়ু। ফেলুদা তার নিজের প্রিয় সোফাটায় বাঁ পায়ের ওপর ডান পা তুলে বসে ছিল। রোববারের সকালে লালমোহন বাবু যথারীতি আড্ডা দিতে আমাদের বাড়ি চলে এসেছেন, কিন্তু ফেলুদা একটু গম্ভীর হয়ে রয়েছে বলে ভদ্রলোক তেমন জমিয়ে উঠতে পারছেন না। ফেলুদার হাতে একটা চারকোণা রঙিন খেলনা, যেটাকে বলে ‘রুবিক্স কিউব’। খেলনাটা পুরোটাই বর্গাকৃতির। এর মধ্যে অনেকগুলো ছোট ছোট চার রঙা বর্গাকার ছকের মত করে কাটা আছে। এর মধ্যে যেকোনো একটা রঙ মিলিয়ে খেলতে হয়। আজকাল খেলাটা পেয়ে বসেছে ওকে, সময় পেলেই নাড়াচাড়া করে দেখে। ফেলুদা কিছু বলছে না দেখে লালমোহনবাবু ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। আমি একবার আড়চোখে ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম। এতো বছর ধরে ফেলুদার সান্নিধ্যে থাকার পরেও উনি বুঝে উঠতে পারেন না, কোনটা ওর ম্যাদামারা ভাব আর কোনটা গভীর চিন্তায় ডুবে থাকা। রুবিক্স কিউব হাতে নিয়ে নাড়তে নাড়তে ওপরে সিলিং এর দিকে ফেলুদার তাকিয়ে থাকাটাই বলে দিচ্ছে, ওর মনের এখন দু নম্বর অবস্থাটা চলছে। ‘প্রফেসর শঙ্কুর নাম শুনেছেন?’ পায়ের ওপর থেকে পা টা নামিয়ে খানিকটা এগিয়ে টেবিলের পাশে কাউচে বসা লালমোহনবাবুর ওপর ঝুঁকে কথাটা জিজ্ঞেস করল ফেলুদা। ‘অ্যাঁ? শঙ্কু! আজ্ঞে সে আমার গড়পারের প্রতিবেশী শঙ্কর চাটুজ্যেকে অনেকে শঙ্কু বলে ডাকে শুনেচি, কিন্তু উনি তো প্রফেসর নন!’ লালমোহনবাবুও খানিকটা সামনে ঝুঁকে এলেন। ‘কেন বলুন তো মশাই? কোন নতুন কেসটেস নাকি?’ ফেলুদা টেবিল থেকে লাইটারটা নিয়ে একটা চারমিনার ধরিয়ে নিল। তারপর আরাম করে টান দিয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচালো। এর অর্থ এবার প্রশ্নটা আমাকে করা হচ্ছে। আমি তাড়াতাড়ি জবাব দিলাম, ‘ঐ বিখ্যাত বাঙালি বৈজ্ঞানিক তো? যার ডায়েরী তোমার কাছে আছে?’ ফেলুদা দুটো ধোঁয়ার রিং ছেড়ে মাথা নাড়ল। ‘হ্যাঁ, তাঁর কথাই বলছি।’ লালমোহন বাবু একটু খাপ্পা হয়ে বললেন, ‘আমি তো মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারছি না মশাই! দয়া করে শজারুর খোঁচা না মেরে এই অধমকে একটু বুঝিয়ে বললে কৃতার্থ হতুম!’ ফেলুদা শ্লেষটুকু হজম করে ওর একপেশে হাসিটা হাসল। আমারও খুব হাসি পেয়ে গেল। লালমোহনবাবুর চেহারায় রাগটা একেবারেই মানায় না। ওঁকে রাগতে খুব একটা দেখি না, তবে সে বড্ড হাস্যকর দৃশ্য। ফেলুদা সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে সোফায় টান হয়ে বসল। এইবার ওর স্কুলমাস্টারের রূপটা বেরিয়ে পড়েছে! ডান হাতের তর্জনীটা তুলে ক্লাসভর্তি ছেলেমেয়েকে লেকচার দেওয়ার ভঙ্গীতে ও বলতে শুরু করল। ‘শুনুন তবে, আপনার ভাষাতেই বলছি! প্রফেসর শঙ্কু, যার পুরোনাম ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু। একজন বিশ্ববিখ্যাত বাঙালি বৈজ্ঞানিক ছিলেন। আপনি যেহেতু এইসব বিশেষণ প্রেফার করেন, এই জন্যেই বলা আরকি! অসামান্য সব আবিষ্কার করে গেছেন এই প্রফেসর শঙ্কু। থাকতেন বিহারের গিরিডিতে। ওখানেই ছিল ওনার ল্যাবরেটরি, গবেষণাক্ষেত্র। গত পনেরো বছর আগে উনি হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান। কেউ।বলে ওনার মৃত্যু হয়েছে, কেউ বলে উনি নাকি কোন এক আবিষ্কারের সার্থে গা ঢাকা দিয়ে আছেন। এই প্রফেসর শঙ্কুর একটা ডায়েরী এবং গুটিকয়েক এক্সপেরিমেন্টের জিনিসপত্র আমার কাছে রয়েছে। নেহাতই শখের বশে সংগ্রহ করা, সে তো বোঝেনই! কাল রাত্রে আমি একটা টেলিফোন পাই। এক ভদ্রমহিলা টেলিফোন করেছিলেন, নাম বললেন মিস প্রজ্ঞাপারমিতা শঙ্কু। উনি নাকি প্রফেসর শঙ্কুর একমাত্র উত্তরাধিকারিণী। কলকাতাতেই থাকেন, আজ একবার আমাদের এখানে আসতে চেয়েছেন। শঙ্কুবাবুর শেষ স্মৃতিগুলো একবার দেখতে চান। আমি হ্যাঁ করে দিয়েছি। আর আধঘণ্টা পরেই এসে পড়বেন আশা করি।’ লালমোহনবাবু বার চারেক হুঁ হুঁ শব্দ করে মন্তব্য করলেন, ‘তিনি যে সত্যিই ওই বিজ্ঞানীর উত্তরাধিকারিণী, তার প্রমাণ আছে কি?’ ফেলুদা সিলিং এর দিকে চেয়ে থেকে জবাব দিল, ‘এভাবে কি কোন ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করা যায়, আপনি শঙ্কুবাবুর উত্তরাধিকারিণী কিনা? তাছাড়া জিনিসগুলো দেখাতে তো ক্ষতি নেই। আমার নিজেরই তো কোন অধিকার নেই এগুলোর ওপর- ওনাকে জিজ্ঞেস করে খামোখা অপদস্থ কেন হতে যাব বলুন?’ লালমোহনবাবু বেশ একগাল হেসে বললেন, ‘তা বেশ ভাল কেসই নিয়েচেন দেখছি!’ তারপর আমার দিকে ফিরে চাপা গলায় বললেন, ‘তোমার নারীবর্জিত দাদার কপালে এমন একজন মহিলা মক্কেল জুটবে- এ কি কোনদিনও ভাবতে পেরেছিলে তপেশ ভায়া!’ আমি আর কিছু বললাম না। ফেলুদা বোধহয় কথাটা শুনতে পেয়েছিল, তাই একটু গলা ঝেড়ে আবার সোফায় গা এলিয়ে দিল। লালমোহন বাবুও বোধহয় ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে চুপ মেরে গেলেন।
ফেলুদার ক্লায়েন্টের আসতে এখনো প্রায় মিনিট পনেরো দেরী- এদিকে চুপচাপ বসে থাকতেও ভাল লাগছে না। ফেলুদাকে না ঘাঁটিয়ে আমি আর লালমোহনবাবু কিছুক্ষণ ওনার পূজোর নতুন উপন্যাসের নাম নিয়ে জল্পনা কল্পনা করে কাটিয়ে দিলাম। আড়চোখে দেখছি ফেলুদা মাঝেমধ্যে রুবিক্স কিউবটা মেলানোর চেষ্টা করছে, আবার ওটা কোলের ওপর ফেলে রেখে ঘনঘন আঙুল মটকাচ্ছে। কিন্তু ওর ক্লায়েন্ট তো শুধু ডায়েরী আর ওই জিনিসগুলো দেখতেই আসছে। এর মধ্যেও কি কোন রহস্যের গন্ধ পেল নাকি ও? দশটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে দরজায় টোকা পড়ল। ফেলুদা দেখলাম তার ক্লায়েন্টের সময়ানুবর্তিতায় বেশ খুশিই হয়েছে! কারণ ওর মুখের গম্ভীর ভাবটা কমে গিয়ে বাহবা দেওয়ার মত একটা ভঙ্গী ফুটে উঠেছে। দেরী না করে গিয়ে দরজা খুললাম। ফেলুদা সবসময় বলে, লেখার সময় যার সম্পর্কে কথা বলা হচ্ছে তার বর্ণনা দিয়ে নিতে। ভদ্রমহিলার নামটা আগেই ফেলুদা বলে রেখেছিল- ইনিই হলেন মিস প্রজ্ঞাপারমিতা শঙ্কু। সাধারণভাবে বলতে গেলে সুন্দরীই বলা চলে। গায়ের রঙ শ্যামলা ধাঁচের। সাড়ে পাঁচফুটের মত হাইট, সাধারণ মেয়েদের যেরকম হয়। বয়স আন্দাজ ২৭-২৮ হবে। ঘিয়ে রঙের একটা শাড়ি পরনে, কাঁধ থেকে লম্বা ব্যাগ ঝুলছে, চোখে মোটা গোল কালো ফ্রেমের চশমা। লালচে চুলগুলো বিনুনি করা। গায়ে কোন গয়না নেই ; সুতরাং একেবারেই আধুনিকা সাজপোশাক। দেখে কেন জানিনা খুব চঞ্চল প্রকৃতির মনে হয়। আমি নমস্কার জানিয়ে ওনাকে ভেতরে নিয়ে এলাম। ‘আসুন প্রজ্ঞাপারমিতা দেবী!’ -ফেলুদা আর লালমোহনবাবু উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করল। প্রজ্ঞাপারমিতা দেবীও প্রতিনমস্কার জানালেন। ফেলুদা ওনাকে সামনের সোফায় বসতে বলে নিজের সোফায় বসে পড়ল। আমি এই ফাঁকে গিয়ে শ্রীনাথকে চায়ের কথা বলে এলাম। ‘আসলে আপনার কাছে তো ঠিক কেস নিয়ে আসি নি, কিছু কথা বলতেই আসা!’ চশমাটা নাকের ওপর ঠেলে দিয়ে বললেন প্রজ্ঞাপারমিতা দেবী। ‘নিঃসংকোচে বলুন। নার্ভাস হবার কোন কারণ আছে বলে তো মনে হচ্ছে না!’ ফেলুদা সোফায় টান হয়ে বসে বলল। প্রজ্ঞাদেবী কাঁপা গলায় বললেন, ‘নার্ভাস! আমি নার্ভাস হচ্ছি সেটা আপনাকে কে বলল?’ ‘আপনি ভেতরে আসার সময় কিছুটা ইতস্তত করলেন, তারপর প্রতিনমস্কার করার সময় প্রথমে হ্যান্ডশেকের মত করে হাত বাড়ালেন। পরক্ষণেই অবশ্য হাত টেনে নিয়ে নমস্কার করলেন, আর এখন চশমাটা বারবার যেভাবে ঠেলছেন তাতে স্পষ্ট আপনার নার্ভাসনেসটা ধরা পড়ছে।-‘ প্রজ্ঞাপারমিতা দেবী খানিকক্ষণ অবাক হয়ে ফেলুদার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎ অবিশ্বাসের গলায় মন্তব্য ছুঁড়লেন, ‘আমি তাহলে যা শুনেছি সবই দেখছি মিলে যাচ্ছে!’ ফেলুদা ওর একপেশে হাসিটা হেসে ভদ্রতা দেখাল। তারপর পায়ের ওপর পা তুলে জিজ্ঞেস করল, ‘প্রফেসর শঙ্কুর ডায়েরীটা যে আমার কাছেই আছে, সেটা আপনি জানলেন কী করে?’ প্রজ্ঞাদেবী চশমাটা আবার ঠেললেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘সত্যজিৎ বাবুর কাছ থেকে। উনিই আমাকে বলেন যে লেখাগুলো আপনার কাছে আছে।’ সত্যজিৎ বাবু হলেন সত্যজিৎ রায়। আমি ফেলুদার কেসগুলো নিয়ে যে গল্পগুলো লিখি, উনি তার সম্পাদক। আমি জানি, ফেলুদাকে ডায়েরীটা উনিই দিয়েছিলেন। ওর তো এসব দিকে খুব ইন্টারেস্ট, তাই ওকে উপহার দিয়েছিলেন লেখাটা। চা এসে গিয়েছিল। প্রজ্ঞাদেবী চায়ের কাপটা তুলে নিয়ে তাতে একটা চুমুক দিয়ে বলতে শুরু করলেন। ‘মাসখানেক আগে একটা পত্রিকায় সত্যজিৎ বাবুর একটা আর্টিকেল পেয়েছিলাম। দাদু, মানে প্রফেসর শঙ্কুর ডায়েরী নিয়ে। উনি নাকি সে ডায়েরীটা পেয়েছেন এবং গিরিডির বাড়িতে গিয়ে নাকি কিছু আবিষ্কারের নমুনাও সংগ্রহ করেছেন। আমি ওনার সাথে যোগাযোগ করেছিলাম, উনিই আমাকে বলেন যে সেগুলো আপনার কাছে রয়েছে। আপনার নাম আমি অনেক শুনেছি মিস্টার মিত্র। সত্যজিৎ বাবুই আপনার ঠিকানা আমাকে দেন, আর বলেন আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে। সেই সূত্রেই আসা।’ ফেলুদা চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখল। তারপর টেবিল থেকে লাইটার তুলে নিয়ে একটা চারমিনার বার করে ভীষণ সাহেবি ঢঙে বলল, ‘ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড- মে আই?’ প্রজ্ঞাদেবীও মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। ‘শিওর! সার্টেনলি।’ ফেলুদা অনুমতি পেয়ে চারমিনারটা ধরিয়ে নিল। এর আগে ওকে কখনো কারো পারমিশন নিয়ে সিগারেট ধরাতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না! লালমোহনবাবু আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে কিছু একটা ইশারা করলেন। ফেলুদা দুটো রিং ছেড়ে বলল, ‘আপনি বললেন প্রফেসর শঙ্কু আপনার দাদু। কিন্তু যতদূর শুনেছি, উনি অকৃতদার ছিলেন। তাহলে কি-‘ প্রজ্ঞাদেবী সামান্য হাসলেন। লক্ষ্য করলাম, হাসলে তাকে বড় সুন্দর দেখায়। তিনি বললেন, ‘আপনাকে তাহলে আমার বংশলতিকাটা বোঝাতে হচ্ছে! শুনুন তাহলে। আমার দাদু ছিলেন প্রফেসর শঙ্কুর আপন খুড়তুতো ভাই। শঙ্কু দাদুর বাবা ছিলেন শ্রী ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু, তাঁর ভাই শ্রী ত্রিদিবেশ্বর শঙ্কু। ত্রিপুরেশ্বরের একমাত্র ছেলে হলেন প্রফেসর ত্রিলোকেশ্বর শিঙ্কু, অর্থাৎ শঙ্কু দাদু। আর ত্রিদিবেশ্বরের একমাত্র ছেলে হলেন ভূলোকেশ্বর শঙ্কু- মানে আমার দাদু। প্রফেসর ত্রিলোকেশ্বর অকৃতদার রইলেন, এদিকে আমার দাদু বিয়ে করলেন। তাঁর একমাত্র ছেলে হলেন আমার বাবা পরমেশ্বর শঙ্কু। আর আমি তার একমাত্র মেয়ে- প্রজ্ঞাপারমিতা শঙ্কু!’ এই প্যাঁচালো বংশলতিকা শুনে মাথাটা কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছিল। তাও ভরসা, ফেলুদা বুঝতে পেরেছে নিশ্চয়ই। ও বুঝতে পারলেই হল। লালমোহনবাবু এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। এখন আর থাকতে না পেরে বললেন, ‘এ যে মহাভারতের বংশলতিকার মত মনে হচ্ছে মশাই! সেই শান্তনুর আমল থেকে পাণ্ডব কৌরব… ভাবা যায়! এখানেও তো তাই মনে হচ্ছে!’ ফেলুদার চারমিনারটা শেষ হয়ে গিয়েছিল। সেটাকে অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে এবার বাঁ পায়ের ওপর ডান পা তুলে দিয়ে কোলের ওপর হাত দুটো ফেলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে প্রজ্ঞাপারমিতার দিকে চাইল। প্রজ্ঞাদেবীর ফেলুদার এই দৃষ্টিটা অনুধাবন করে বলতে শুরু করলেন। ‘আমার পূর্বপুরুষেরা কেউ জীবিত নেই। শঙ্কু দাদু জীবিত কি মৃত, তারও তো এখনো কোন সুরাহা হয় নি! উনি গিরিডিতে থাকতেন, আর আমার দাদু বেরিলিতে। আমার বাবাও পিতৃসূত্রে ওখানেই থাকতেন। বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন, আমিও ওখানে ছিলাম। মা আমার জন্মের সময়েই মারা যান। আমার যখন সতেরো বছর বয়স, তখন বাবাও পরলোকগত হন ; আর আমি কলকাতায় আমার মামাবাড়িতে মানুষ হই।
বাবাই আমাকে বলে গিয়েছিলেন শঙ্কু দাদুর কথা। উনি নাকি খুব ছোট্ট বেলায় আমাকে একবার দেখতে বেরিলি এসেছিলেন, সে কথা আমার মনেও নেই। বাবার ইচ্ছে ছিল আমি যদি কখনো শঙ্কু দাদুর খোঁজ পাই, যেন তাঁর পায়ের ধূলো নিই। কারণ পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউই তো আর বেঁচে নেই! আমিই এ বংশের শেষ সদস্য। বাবার ইচ্ছেটা কী করে পূরণ করা যায়, সে নিয়ে অনেক ভেবেছি। দাদুর খোঁজ এতো দিনে কেউ বার করতে পারেনি, আমি তো কোন ছাড়। কী করে তাঁর সন্ধান বার করা যায় বুঝে উঠতে পারিনি। আমার মামাবাড়ির লোকেরা এ নিয়ে কখনো আমায় সাপোর্ট দেয় নি, কারণ আমি যে ওদের বাড়ির আশ্রিতা, সে কথা আমায় পদে পদে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। যখন পত্রিকায় দাদুর ডায়েরীর কথাটা পড়লাম, মনটা একেবারে নেচে উঠল। তাঁকে চোখের দেখা দেখতে না পাই, অন্তত ডায়েরীর পাতায় হাত বুলিয়ে তাঁকে অনুভব তো করতে পারব!’ এ টুকু বলে তিনি থামলেন। দেখতে পেলাম, চশমাটা খুলে নিয়ে খুব সাবধানে চোখের কোণাটা হাত কড়ে আঙুল দিয়ে মুছে নিলেন। আমাদের ভারী আসোয়াস্তি হতে লাগল। এরকম অবস্থায় কস্মিনকালেও পড়তে হয়নি বলেই – ফেলুদা পা নামালো। তারপর গলা খাকড়ি দিয়ে বলল, ‘আমি প্রফেসরের ডায়েরী আর আবিষ্কারগুলো অত্যন্ত যত্নে রেখেছি। আপনি দেখতে চান?’ পরমুহূর্তে দেখলাম প্রজ্ঞাদেবীর চোখে কোন জল নেই। সহজ স্বাভাবিক আর সেই চঞ্চল চোখে চশমাটা পরে নিয়েছেন।

 

আশ্চর্য শক্ত মেয়ে বলতে হবে! তিনি শান্তগলায় বললেন, ‘ওগুলো দেখবার জন্যে তো আসা! আপনি যদি -‘
ফেলুদা উঠে দাঁড়াল। ‘অবশ্যই! একটু অপেক্ষা করুন।’
বলেই ও সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল, নিজের ঘরে যাচ্ছে বোধহয়।
প্রজ্ঞাদেবী আমাদের সঙ্গে গল্প করতে লাগলেন। জটায়ুর লেখা উনি পড়েছেন, এবং উনি নিজেও নাকি টুকটাক লেখালিখি করেন – এসব নিয়েই কথা হচ্ছিল।
এমন সময় ফেলুদা সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো।
হাতে একটা বাক্স।
কাঠের তৈরি বড় চৌকোনা বাক্স।
সেটা নিয়ে এসে ও টেবিলের ওপরে রাখল। তারপর নিজে সোফায় বসে বাক্সের ডালাটা খুব সাবধানে খুলে ফেলল।
বাক্সের ভেতর একটা গুমোট ঝাঁঝালো গন্ধ। ভেতরে রয়েছে একটা লাল মলাটের ছেঁড়া ডায়েরী, যেটা আমি আগেও দেখেছি। আর রয়েছে কিছু টেস্টটিউব, একটা বুনসেন বার্নার, কয়েকটা বোতল। বিভিন্ন রঙ এর তরল রয়েছে ওই বোতলগুলোয়।
ফেলুদা বাক্সটা প্রজ্ঞাপারমিতার দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বলল, ‘এগুলো সংগ্রহে রাখার মতই জিনিস! সত্যজিৎ বাবু ওই বেরিলির বাড়ি থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। বেশ পুরোনো হয়ে গেছে যদিও। আর এই হল সেই বিখ্যাত ডায়েরী।’ বলেই আবার সোফায় ঠেস দিয়ে বসে একটা চারমিনার ধরালো।
প্রজ্ঞাপারমিতা দেবী কাঁপা হাতে ডায়েরীটা তুললেন। তারপর খুব সাবধানে এমনভাবে ছেঁড়া মলাটটা ওল্টালেন, যেমন করে কেউ কোন নবজাতক শিশুকে কোলে নেয়! আস্তে আস্তে মোলায়েম হাতে ডায়েরীর পাতাগুলো একের পর এক উল্টে যেতে লাগলেন।
আমি দেখলাম, ওনার চোখ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় জল প্রত্যেকটা পাতায় পড়ছে।
প্রজ্ঞাদেবী কাঁদছেন।
দাদুর ফেলে যাওয়া ডায়েরীটা বুকে জড়িয়ে কাঁদছেন।
বেশিক্ষণ এসব দৃশ্য দেখা যায় না; কেমন যেন একটা কষ্ট হয় বুকের ভেতর। শুধুমাত্র ফেলুদাই নির্বিকার- এটা বোধহয় কেবলমাত্র ওর পক্ষেই সম্ভব।
কিছুক্ষণ পর প্রজ্ঞাদেবী চোখ মুছে বাক্সের বাকি জিনিসগুলোতে কয়েকবার করে হাত বোলালেন- এবারেও নবজাতক শিশুকে আদর করার ভঙ্গীতে। একটু জোরে ধরলেই যেন ওগুলো ব্যথা পাবে!
দেখাটেখা শেষ করে সমস্ত জিনিস আবার আগের মত বাক্সবন্দী করে রেখে দিলেন প্রজ্ঞাদেবী।
শুধু ডায়েরীটা হাতে রেখে দিলেন।
তারপর ফেলুদার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এটা কি আমি নিতে পারি?’
‘সার্টেনলি! এটা তো আপনারই প্রাপ্য।’
‘বেশ, তবে এটা আমি নিচ্ছি!’ ফেলুদার কথায় বেশ খুশি হয়ে প্রজ্ঞাদেবী ডায়েরীটা নিজের ব্যাগে পুরে নিলেন।
ফেলুদা কিছুক্ষণ প্রজ্ঞাদেবীর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলল। তারপর বলল, ‘নিঃসংকোচে বলে ফেলুন!’
প্রজ্ঞাদেবী বিস্ফারিত চোখে ওর দিকে তাকালেন।
‘আপনি কীভাবে-‘
‘আপনি যখন ডায়েরীটা ব্যাগে ঢোকাচ্ছিলেন তখনই একটু ইতস্তত ভাব করছিলেন। আপনার বারবার হাত মুঠো করা আর খোলা থেকেই বোঝা যাচ্ছে আপনি কিছু বলতে চাইছেন, কিন্তু সংকোচ কাটিয়ে বলে উঠতে পারছেন না।’
ফেলুদার এই ব্যাপারটা না আমি ঠিক বুঝি না। একটা মানুষের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ঠিক কতখানি তীক্ষ্ণ হলে সে মানুষের মুখ দেখেই মনোভাব বলে দিতে পারে!
প্রজ্ঞাদেবী মনে হল খুব কষ্টে নিজেকে সংবরণ করলেন। তারপর গলা ঝেড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ। আমি আসলে আপনাকে একটা অফার দিতে চাইছিলাম। আপনি যদি রাজি থাকেন তো-‘
ফেলুদা বলল, ‘আগে অফারটা কী, সেটা তো শুনি!’
প্রজ্ঞাদেবী হেসে বললেন, ‘নিশ্চয়ই! আসলে আপনাকে তো বলেইছি, দাদুর খোঁজ বার করার জন্য আমাকে সাহায্য করতে পারে, এমন কাউকে আমি পাইনি। কারো সাহায্যই পাই নি! খোঁজ পাওয়া তো প্রায় অসম্ভব, তাই আমি ভাবছিলাম যে গিরিডিতে দাদুর বাড়ি থেকে একবার ঘুরে আসবো। ঠিকানাটাও সত্যজিৎ বাবু দিয়ে দিয়েছেন, আমি জানতাম না। কিন্তু সমস্যা হল আমি একা ওখানে যাওয়ার ভরসা পাচ্ছি না। মানে কী করে গিয়ে বাড়িটা খুঁজব, কী করব, ভেবে উঠতে পারছি না। আপনি, মানে আপনারা তিনজনেই যদি আমার সঙ্গে গিরিডি চলেন – শুনেছি আপনাদের ট্র‍্যাভেলিং এর শখ খুব! গিরিডি বেড়ানোর জন্যেও ভাল জায়গা; যদি ফেলুবাবু থাকেন, আমি খুব ভরসা পাবো! আর আপনাদের যাওয়া আসার সমস্ত খরচার দায়িত্ব আমার। আপনারা যদি-‘
ফেলুদা পা নামিয়ে বসল। ওর কপালে ত্রিশূলের মত ভাঁজ। এ ভাঁজ আমি চিনি। মনে হচ্ছে আমাদের বিহার যাওয়াটা এবার কেউ আটকাতে পারবে না!
ফেলুদা কিছু সময় পর বলল, ‘দেখুন প্রজ্ঞাদেবী আপনার প্রস্তাবটি অতি উত্তম, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। আমি ভেবে দেখব এ ব্যাপারে। আজ রাতের মধ্যেই আপনাকে জানিয়ে দেব- আপনার নাম্বারটা?’
‘ডাইরেক্টরিতে পাবেন। প্রজ্ঞাপারমিতা শঙ্কু নামে একজনই আছেন, আমি।’
‘বেশ বেশ, আমরা যদি যাই আপনাকে জানিয়ে দেব আজ রাতের মধ্যেই।’ ফেলুদা বলল।
প্রজ্ঞাপারমিতা উঠে দাঁড়ালেন। চোখেমুখে খুশির স্পষ্ট ঝিলিক। ‘আপনাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেব ফেলুবাবু- ওহ ভাল কথা! আপনার এতটা সময় নষ্ট করলাম ; পারিশ্রমিকটা-‘ এই বলেই ব্যাগ খুলতে শুরু করলেন।
ফেলুদা ওনাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘মাথা খাটাবার কেস ছাড়া যে আমি পারিশ্রমিক নিই না প্রজ্ঞাদেবী! আপনি তো শুধু আপনার দাদুর জিনিসগুলো দেখতে এসেছিলেন। আর গিরিডি যাওয়ার ব্যাপারটা, সেও তো আপনারই খরচে। এটা কি কোন কেস হল? সুতরাং পারিশ্রমিকও আমি নিচ্ছি না-‘
প্রজ্ঞাপারমিতা হেসে থেমে গেলেন। আমরা তাকে দরজা অবধি পৌঁছে দিলাম। যাওয়ার আগে উনি আমায় বলে গেলেন আমি নাকি ওনার ছোটভাইয়ের মত- আর আমি যেন ওনাকে দিদি বলে ডাকি।
আর লালমোহনবাবুকে বললেন যদি আমরা যাওয়া কনফার্ম করি, উনি নাকি ওনার কয়েকটা লেখার পাণ্ডুলিপি নিয়ে আসবেন। ফেলুদা ওনাকে একটা ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে এল।ফিরে এসেই দেখলাম বাক্সটা নিয়ে নিজের ঘরের দিকে ছুটল। লালমোহনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘যাচ্চেন কোথায় মশাই?’
উত্তর এল, ‘কৌতূহল মেটাতে।’

 

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here