Home গল্প গল্পঃ শূন্যতা || তিফা

গল্পঃ শূন্যতা || তিফা

122
0

কানাডায় আছি প্রায় আট বছর হয়ে যাচ্ছে। অনেক নামকরা সার্জেন্ট হয়েছি। সবাই আমাকে চিনে। ছোটবেলার স্বপ্ন ছিল আমার একদিন খুব নাম হবে, অনেক টাকা থাকবে। যতটা চেয়েছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশিকিছু পেয়ে গেছি। নিজের বিশাল বড় একটা বাড়ি আছে এখানে। দুটো গাড়িও আছে। টাকার কোনো অভাব নেই। পারফেক্ট লাইফ, ঠিক যেমনটা চেয়েছিলাম। এই স্বপ্নগুলো পূরণের জন্য আট বছর আগে বড় একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। আমি আজও যাচাই করতে পারিনি সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল নাকি ভুল! স্বপ্নের এই জীবন পেতে যেই জিনিসটা আমি ফেলে এসেছি সেটা আজও মনে পড়ে। এই বিশাল বড় বাড়িতেও নিজেকে অনেক একা একা লাগে। অনেক বছরতো হয়ে গেলো, একবার কি যেয়ে ঘুরে আসবো নিজের বাংলাদেশ থেকে?

ভেবেই টিকেট বুক করা হয়ে গেলো। এইতো মাত্র কয়েক ঘন্টা পর আবার দেখতে পারবো আট বছর আগে ফেলে আসা দেশটাকে। চাপা একটা এক্সাইটমেন্ট কাজ করছিলো।

এয়ারপোর্ট, ইমিগ্রেশন, সিরিয়াল ইত্যাদি ঝামেলা শেষে প্রায় আর্ধেক দিন পর পৌঁছে গেলাম বাড়িতে। বাড়িটা একদম খালি। আগে এখানটাতেই মা আমাকে কত আদর করেছে, মুখে নলা তুলে খাইয়ে দিয়েছে, বাবা শাসন করেছে, পরামর্শ দিয়েছে, আরো কত কী! আজ তারা কেউ নেই। পৃথিবীতে ভাই-বোন না থাকার মতো বিড়ম্বনা বোধ হয় আর নেই। সবকিছু শূন্যতার চাদরে ঢাকা। হঠাৎ বাড়ির উঠোনে একটা ছোট ছেলে এসে পড়ে। মিষ্টি একটা বাচ্চা। সময়মত যদি বিয়েটা করে ফেলতাম এতদিনে হয়তো আমার ও এমন একটা ছেলে থাকতে পারতো। অনেক উৎসাহ নিতে বাচ্চাটাকে নাম জিজ্ঞেস করি।

– বাবু নাম কি তোমার? কোথায় থাকো?

কঠিন বিষ্ময় নিয়ে সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন আগে কেউ তাকে এমন অদ্ভুত প্রশ্ন করেনি! হঠাৎ একটা পরিচিত কণ্ঠ ডাক দিয়ে উঠে, “রায়হান”!

এই কণ্ঠটা খুব পরিচিত। সম্ভবত আমার খুব কাছের কেউ।

আমি ঘুরে দাঁড়াতেই আটকে যাই! আট বছর আগে ফেলে চলে যাওয়া ভালোবাসা মাহমুদ! ও একটুও বদলায়নি। কণ্ঠ আগের মতোই ভারী। ভাবিনি যে এত বছর পর এভাবে দেখা হবে আর অনুভুতিটা ঠিক আগের মতোই হবে! কিছুক্ষণের জন্য আমাদের চোখ আটকে গেছে, যেন সেই অতীতে ফিরে গেছি! কত স্বপ্ন দেখেছিলাম একসাথে, কত মুহূর্ত কেটেছিল! ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করেছিলাম কত! কিন্তু আজকের বাস্তবতা যে সেই পরিকল্পনাগুলোর সাথে মিলছে না!

বাচ্চাটা মাহমুদ কে আব্বু বলে ওর কোলে উঠে পড়ে। বুঝতে বাকি রইলো না।

মাহমুদ আমার কাছে এসে পুরনো আত্মীয়দের মত করে বললো, “রায়হান আমার ছেলে। বাড়িতে এসো বিকেলে, দাওয়াত রইলো”।

এত আগে যাকে ছেড়ে দিয়েছি তার প্রতি আজ এই অনুভুতিটা কেন আসছে, বুঝতে পারছিলাম না! এমনতো হওয়ার কথা ছিলো না!

বিকেলে বেশ সেজেগুজে মাহমুদের বাসায় যাই। জানিনা কেন, কিন্তু সম্ভবত ও’র জন্যই সেজেছিলাম।  দরজার কড়া নাড়তেই একজন ভদ্র মহিলা দরজা খুললো। মনে হচ্ছিলো ইনি এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন, আমি আসলেই দড়জা খুলে দিবেন। ভেতরে ঢুকেই বুঝলাম মাহমুদের স্ত্রী। বাসার ভেতরে চারিদিকে বিভিন্ন জায়গায় স্বামী-স্ত্রীর ছবি বাঁধাই করে রাখা আছে। রায়হান ও আছে। মাহমুদের এত সুখের সংসার দেখে আমার বুকটা খা খা করছিলো। ঠিক যেভাবে আগে ওকে অন্য মেয়ের সাথে দেখলে করতো!

ওর বউ তেমন সুন্দরী না। কিন্তু আজ প্রথম এরকম সাধারণ একটা মেয়েকে দেখে এত হিংসে হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন আমার এত পাওয়া ওর এই সুখের সামনে কিছুই না!

মাহমুদ ওর স্ত্রীর সাথে এতটা স্নেহ করে কথা বলছিলো ঠিক যেমনটা আমার সাথে বলতো। আজ প্রথমবার আমার মনে হচ্ছে সিদ্ধান্তটা বোধ হয় ভুল ছিল! মাহমুদ আমাকে ভুলেই গেছে। ওর চাহনিতে বিন্দুমাত্র ভালোবাসা নেই!

খাওয়া দাওয়া শেষ করে ‘ও আমাকে বিদায় দিতে আসলো। ধৈর্য ধরে থাকতে না পেরে শেষে বলেই বসি, মাহমুদ তুমি আমাকে ভুলে গেলে এত সহজে! বিয়ে করে ফেলেছো, এত সুখের সংসার, আমাকে একটুও মিস করোনি?

কিছুক্ষন দু’জনই চুপ করে ছিলাম। সাময়িক নিরবতা শেষে আটকে রাখা নিশ্বাসটা ছেড়ে দিয়ে মাহমুদ আমাকে বলে , “আট বছর আগে তুমি আজকের এই সময়টা কেমন হবে নির্ধারণ করেছিলে। সেদিন অনেক কান্না করেছিলাম। তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে! তোমার জন্য ক্যারিয়ার আমার থেকে বেশি জরুরি ছিল! আর ভালোই তো, যা চেয়েছিলে তাই হয়েছে। শুনেছি চিকিৎসার জগতে অনেক নাম তোমার। আমি আজীবনই সাধারণ একটা লাইফ আর ছোট খুশিগুলো চেয়েছি আর আমার ওয়াইফ আমাকে অনেক ভালোবাসে।আমি সবকিছু পেয়েছি।”

মাহমুদের প্রত্যেকটা কথা খুব যন্ত্রনা দিচ্ছিলো। বিদায় দিয়ে ও চলে গেলো। আমি বাড়ি ফিরে পুরোনো আলমারি থেকে আমাদের ছবির অ্যালবামগুলো বের করি। ছবিগুলোতে আমাকে খুব খুশি দেখাচ্ছে। শেষ হয়তো ওই সময়গুলোতেই এত প্রাণ খুলে হেসেছিলাম। এতকিছু পেয়েও আজ এত একা আমি। মাহমুদকেই ভালোবেসেছি, তাই হয়তো বিয়েটা আজও করিনি। হয়তো সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল। কিন্তু জীবনে বড় কিছু পেতে গিয়ে কখন যে ছোট ছোট মূল্যবান জিনিসগুলো আমরা হারিয়ে ফেলি তা বোঝা কঠিন! খুব বিরক্তি নিয়ে নিজের বাছাই করা ভাবলেশহীন জীবনে আবার ফিরে আসি। কিছু জিনিস চাইলেও বদলানো যায় না। ভালো থাকুক ভালোবাসার মানুষগুলো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here